মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান: বিনিয়োগ বাড়ান, কর্মসংস্থানে পাশে থাকুন

পুত্রজায়া, ২২ জুন ২০২৬:
প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া গিয়ে দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতো’ সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিকের একটি ফোনকল তিনি পেয়েছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছ থেকে। তখন তাকে অভিনন্দন জানিয়ে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম বিদেশ সফরে তিনি মালয়েশিয়ায় এসেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের ঐতিহাসিক দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মালয়েশিয়া সফর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেছিল এবং শ্রম সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করেছিল। পরে ১৯৯৩ সালে তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সফর দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করে।

তিনি মালয়েশিয়ার সরকার ও জনগণের উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রম, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে যৌথ কমিশন সভা এবং দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা। পাশাপাশি বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জনগণের শক্তিশালী সমর্থন পেয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরেছে। সরকারের প্রধান লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।

মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল শিল্প, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।

মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশি শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তাদের দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে অনিয়মিত বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধতা দেওয়া এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভব হলে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। দুই দেশই শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ন্যায্য ও কম খরচের করার বিষয়ে একমত হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি।

আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে চায়। দেশটি আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি)-তে যুক্ত হওয়ার বিষয়েও আগ্রহ রয়েছে বাংলাদেশের।

বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে তারা মতবিনিময় করেন। জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে।

বাংলাদেশের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের প্রার্থিতায় মালয়েশিয়ার সমর্থনের জন্যও কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী।

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আজকের আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে। দুই দেশ যৌথ সমৃদ্ধি, আঞ্চলিক শান্তি এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *