প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছে সরকার। মাত্র ১৮ ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত সফরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সমঝোতা হয়েছে।
সফর শেষে কুয়ালালামপুরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানানো প্রথম কয়েকজন বিশ্বনেতার মধ্যে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতো সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম ছিলেন অন্যতম। সেই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়াতেই তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফর শুরু করেন।
মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানানো হয়। কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। বিমানবন্দর থেকে হোটেল পর্যন্ত সড়কপথ বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হয়। পুত্রাজায়াতেও তাঁকে বিশেষ রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা দেওয়া হয়।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন। পরে দুই দেশের প্রতিনিধিদল নিয়ে সীমিত ও সম্প্রসারিত পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দারের সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাৎ হয়।
বৈঠকগুলোতে রাজনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর খাত, শিক্ষা, পর্যটন, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশ ৯টি খাতে সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে ৩৩ দফা যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে।
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও রাজার সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেন। তিনি কম খরচে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অধিক সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান।
এছাড়া মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন কারণে অবৈধ অবস্থায় থাকা বা কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের অনুরোধ জানান । উভয় পক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের প্রশংসা করে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুই দেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, শিল্প, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। হালাল শিল্পের সম্ভাবনাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ খাতে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে হালাল পণ্য উৎপাদন, সনদ প্রদান ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে।
ডিজিটাল অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রযুক্তি পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
শিক্ষা খাতে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অংশীদারিত্ব, যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণের বিষয়ে মতৈক্য হয়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন বলে জানানো হয়।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক প্রশিক্ষণ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।
জ্বালানি খাতে এলএনজি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকা এবং আরসিইপি-তে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সহযোগিতার বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে।
সফরে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সন্ত্রাস দমন বিষয়ে দুটি এক্সচেঞ্জ অব নোটস বিনিময় করা হয়েছে।
সফরকালে মালয়েশিয়ার পাঁচটি শীর্ষ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল পেট্রোনাস, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পার্ডুয়া এবং এমএমসি পোর্ট।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই প্রথম বিদেশ সফর বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও জনসম্পৃক্ত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।