ঢাকায় জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গ্যোটে-ইনস্টিটিউট বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য, সংগীত ও জার্মানির সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘ফ্রম দ্য মেমোরি লেন—রবীন্দ্রনাথ টেগোরস পোয়েটিক জার্নি টু জার্মানি’।
শনিবার (২০শে জুন) সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে গ্যোটে-ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে গান, কবিতা, ভিডিওচিত্র ও ধারা বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জার্মানি ভ্রমণ, তাঁর সাহিত্যচিন্তা এবং বিশ্বমানবতার দর্শন।
বীণার সুরে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে প্রথমে প্রদর্শিত হয় রবীন্দ্রনাথের জার্মানি সফর নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র। এতে ১৯২১ সালে প্রথম, ১৯২৬ সালে দ্বিতীয় এবং ১৯৩০ সালে তৃতীয়বার জার্মানি সফরের নানা স্মৃতি তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনসহ সমকালীন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কবিগুরুর সাক্ষাতের বিষয়ও স্থান পায় ভিডিওচিত্রে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল গ্যোটে-ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের পরিচালক ফ্রাঙ্ক ভার্নারের অংশগ্রহণ। তিনি জার্মান ভাষায় রবীন্দ্রনাথের গান ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ’-এর আবৃত্তি করেন। এছাড়া ‘গীতাঞ্জলি’ থেকে একটি কবিতার জার্মান অনুবাদও পাঠ করেন।
এরপর রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী সঞ্চিতা রাখি একক সংগীত পরিবেশন করেন। ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ’ গান দিয়ে শুরু করে তিনি পরপর দশটি রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন। এর মধ্যে ছিল ‘মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজি’, ‘সে কোন পাগল যায় পথে তোর’, ‘কার চোখের চাওয়ার হাওয়ায় দোলায় মন’, ‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়’, ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ এবং ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি’সহ আরও কয়েকটি গান। বাংলা গানের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষ্যে তুলে ধরা হয় প্রতিটি গানের ঐতিহাসিক ও সৃষ্টিপ্রেক্ষাপট।
গানের পরিবেশনার ফাঁকে ফাঁকে রবীন্দ্রনাথের জার্মানি সফর ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বর্ণনা করেন স্থপতি ধ্রুব জ্যোতি।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংগীত শুধু বাংলাভাষী সমাজে নয়, বিশ্বসংস্কৃতির পরিসরেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাঁর সঙ্গে জার্মানির সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক সম্পর্ককে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই ছিল এ আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য। বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় ১৯২৬ সালে রচিত গানগুলোকে, কারণ এ বছর সেসব গানের শতবর্ষ পূর্ণ হচ্ছে।
সমাপনী বক্তব্যে ফ্রাঙ্ক ভার্নার বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জার্মান কবি গ্যেটে ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মানুষ হলেও তাঁদের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল বিশ্বমানবতা। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার লাভের পর রবীন্দ্রনাথ বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করে জাতি ও সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার বার্তা ছড়িয়ে দেন। ১৯১৯ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে জার্মানিতে তাঁর ২৫টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়া সেখানে তাঁর জনপ্রিয়তার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, গ্যেটে ইউরোপের বাইরে না গেলেও ভারতীয় সাহিত্য ও দর্শনের প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। বিশেষ করে কালিদাসের ‘শকুন্তলা’র জার্মান অনুবাদ তাঁকে ভারতীয় ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত করে। রবীন্দ্রনাথ ও গ্যেটে দুজনই শুধু কবি নন, তাঁরা ছিলেন দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও শিল্পী, যাঁদের মানবতাবাদী চিন্তা আজও বিশ্বসংলাপের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংগীত পরিবেশনা শেষে সঞ্চিতা পাল বলেন, এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে জার্মানি রবীন্দ্রনাথকে শুধু নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে নয়, সংস্কৃতি, শিক্ষা, শিল্প ও বিশ্বমানবতার দূত হিসেবেও স্মরণ করে।
দুই ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠানে হলভর্তি দর্শক-শ্রোতা উপস্থিত ছিলেন। সংগীত পরিবেশনায় অক্টোপ্যাডে ছিলেন বিদ্যুৎ রায়, তবলায় গৌতম কুমার সরকার, এসরাজে মো. আশিকুল ইসলাম, গিটারে মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন এবং কিবোর্ডে রবিনস চৌধুরী।
আয়োজকদের মতে, এই অনুষ্ঠান ছিল বাংলা ও জার্মান সংস্কৃতির পারস্পরিক বিনিময়কে উদ্যাপন করার পাশাপাশি দর্শন, সাহিত্য ও মানবতাবাদকে ঘিরে এক অনন্য বঙ্গ-জার্মান সাংস্কৃতিক সংলাপ।