ইরান ইস্যুতে বাড়ছে নেতানিয়াহু-ট্রাম্প দ্বন্দ্ব

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া নতুন সমঝোতার প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু হয়তো ধীরে ধীরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন হারাচ্ছেন—এবং তার হাতে কোনো বিকল্প পরিকল্পনাও নেই।
যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্পের ধারণা ছিল, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান খুব সহজ হবে এবং দ্রুত সফলতা আসবে। হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে নেতানিয়াহু ও মোসাদের প্রধান ডেভিড বারনিয়া তাকে এমন বার্তাই দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা তখন থেকেই পরিস্থিতিকে অনেক বেশি জটিল বলে মনে করছিলেন, তবু ট্রাম্প নেতানিয়াহুর মূল্যায়নের পক্ষেই অবস্থান নেন। পরে তিনি বুঝতে পারেন, বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
যুদ্ধ চলাকালে ব্যাপক পাল্টাপাল্টি হামলার পরও ইরান আত্মসমর্পণ করেনি। বরং দেশটি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। তখন ট্রাম্প উপলব্ধি করেন, পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এরপর তিনি ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রেখে সংঘাতের দ্রুত অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প কিছুদিন ধরেই যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টা করছিলেন। এ জন্য তিনি ইরানের প্রতি নানা ধরনের হুমকিও দিয়েছিলেন। তবে তেহরান এসব হুমকিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। এরপর বৈরুতে ইসরায়েলের হামলা ওয়াশিংটনের কাছে ট্রাম্পের প্রতি এক ধরনের চপেটাঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়।
মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধে জড়িয়েছিল, কিন্তু পরে তারা দেখতে পায়, নেতানিয়াহু পর্দার আড়াল থেকে আলোচনাকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা করছেন। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প এবং তার ঘনিষ্ঠদের কাছে ঘটনাটি ঠিক এভাবেই প্রতীয়মান হয়েছে।
ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছেন এবং তার বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইসরায়েল টিকে থাকতে পারত না। তবে বৈরুত হামলাকে তিনি অকৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন, নেতানিয়াহুর দৃষ্টিভঙ্গি তার সঙ্গে মেলে না। নেতানিয়াহু অন্য কিছু চান। তিনি যুদ্ধের অবসান চান না, চুক্তিও চান না। তিনি আবার বোমাবর্ষণে ফিরতে চান। এর জেরে ট্রাম্প নাকি রাজনৈতিকভাবে নেতানিয়াহুকে দুর্বল করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, নেতানিয়াহু হয়তো পরবর্তী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। রাজনৈতিক ভাষায় এটি নেতানিয়াহুকে সরে যাওয়ার বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া ট্রাম্প সম্প্রতি বলেন, তিনি সিরিয়াকে হিজবুল্লাহ মোকাবিলার সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। তার মতে, হিজবুল্লাহ যদি উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় রকেট নিক্ষেপও করে, তবু তাতে কেউ হতাহত না হলে পরিস্থিতিকে স্বাভাবিকই ধরা যেতে পারে এবং প্রতিক্রিয়া দেখানো জরুরি নয়।
ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তন কখনোই তার লক্ষ্য ছিল না এবং বর্তমান ইরানি সরকার যুক্তিসংগত আচরণ করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের ধারণা, নেতানিয়াহুর হাতে এখন খুব বেশি বিকল্প নেই এবং তিনি পাল্টা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবেন না।
কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে নেতানিয়াহুর নিজস্ব কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি বা সমর্থনব্যবস্থা নেই; কার্যত তিনি ট্রাম্পের ওপরই নির্ভরশীল।
নেতানিয়াহুও বিষয়টি ভালোভাবেই জানেন এবং বুঝতে পারেন, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের দড়ি ছিঁড়ে ফেলতে পারেন না।
তবে সময় দ্রুত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যখন ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো কিংবা তাকে আবার নিজের পক্ষে টেনে আনার চেষ্টা—দুটোর একটিকে হয়তো এড়ানো সম্ভব হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *