আস্থার সংকটে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক

কূটনীতিতে প্রতীকী ঘটনার গুরুত্ব অনেক সময় আনুষ্ঠানিক আলোচনার চেয়েও বেশি। দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর কৌশলগত উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করার ঘটনাটি ঠিক তেমনই এক ‘প্রতীকী সংকেত’, যা দুই দেশের সম্পর্কের বিদ্যমান অস্বস্তিকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। সোমবার (১৫ই জুন) ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় ডেপুটি হাই কমিশনারকে তলব করে সরকারের কড়া অবস্থান জানানোর ঘটনাটি প্রমাণ করে, ঢাকা এখন আর ‘ওয়ান-ওয়ে’ বা একতরফা সম্পর্কের সমীকরণে চলতে রাজি নয়।

একজন রাষ্ট্রপ্রধানের বিশেষ প্রতিনিধির প্রতি একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যে আচরণ করা হয়েছে, তা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মৌলিক নিয়মগুলোর পরিপন্থী। যখন একটি নতুন সরকার দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন আঙ্গিকে সাজানোর চেষ্টা করছে, তখন এই ধরনের ঘটনা কেবল ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেয় না, বরং দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। এটি কেবলই একটি প্রশাসনিক তল্লাশি নয়, বরং ঢাকার নতুন নেতৃত্বের প্রতি নয়াদিল্লির এক ধরণের ‘বার্তা’ কি না—সেই প্রশ্নটি এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

এই ঘটনাকে ‘অপ্রত্যাশিত এবং দুর্ভাগ্যজনক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনেই ঢাকা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার প্রতি এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। সোমবার রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় ডেপুটি হাই কমিশনারকে তলব করে নয়াদিল্লিকে ঢাকার আনুষ্ঠানিক অবস্থান ও ক্ষোভ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও এই ঘটনার বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখনও কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

দিল্লি বিমানবন্দরের এই ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের এমন এক সংকটময় মুহূর্তে ঘটল, যখন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পথে ছিল। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছে। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির নিরংকুশ বিজয়ের পর তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলে সম্পর্ক কিছুটা উন্নতির দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে বিমানবন্দরে হয়রানির এই ঘটনা সেই উষ্ণতায় নতুন করে জল ঢেলেছে।

শুধু এই ঘটনাই নয়, গত কয়েক মাস ধরে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ চলছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং বাংলাদেশ বারবার তার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও ভারতের নীরবতা ঢাকার জন্য একটি বড় কূটনৈতিক বিরক্তির কারণ। তারেক রহমানের নতুন সরকার যেখানে স্বচ্ছতা ও সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্কের ভিত্তি গড়তে চাইছে, সেখানে শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের অস্পষ্ট অবস্থান সম্পর্কের স্বাভাবিকায়নের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর বাইরে রয়েছে সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ বা জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর ইস্যু। সম্প্রতি সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) এমন বেশ কয়েকটি চেষ্টা বানচাল করেছে। গত সপ্তাহেই নয়াদিল্লিতে বিজিবি এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর বৈঠক হয়েছে। সেখানে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও যৌথ টহল জোরদার করার সিদ্ধান্ত হলেও, অনুপ্রবেশকারীদের ‘পুশ-ইন’ করার বিষয়টি এখনও এক কাঁটা হয়েই রয়ে গেছে।

দিল্লি বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনা দুই প্রতিবেশী দেশের জন্য একটি কূটনৈতিক পরীক্ষা। নতুন সরকারের অধীনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। ঢাকা চাইছে সম্মানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে, অন্যদিকে নয়াদিল্লিকেও এই নতুন সরকারের সংবেদনশীলতা বোঝার পাশাপাশি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের খেয়াল রাখতে হবে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ছোট ঘটনাটি যদি কূটনৈতিকভাবে সঠিক ও মর্যাদার সাথে নিরসন না করা হয়, তবে তা দুই দেশের জটিল কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *