শ্রম আইনে গৃহকর্মীদের ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও সেই স্বীকৃতির পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনও হয়নি। ফলে দেশের লাখো গৃহকর্মী এখনও ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন শ্রম অধিকারকর্মী ও গৃহকর্মী নেতারা।
আন্তর্জাতিক গৃহকর্মী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে মঙ্গলবার (১৬ই জুন) কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গৃহকর্মী জাতীয় ফোরাম-বাংলাদেশ (ডিডব্লিউএনএফ-বিডি) এবং সুনীতি প্রজেক্টের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সংহতি সমাবেশে এ দাবি জানানো হয়। সমাবেশ শেষে মানববন্ধন ও র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ৬৫০ জন গৃহকর্মী, শ্রম অধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মী অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ২০১১ সালের ১৬ই জুন গৃহকর্মীদের জন্য শোভন কাজ নিশ্চিত করতে কনভেনশন-১৮৯ গ্রহণ করে। সেই ঐতিহাসিক দিনকে স্মরণ করে প্রতিবছর ১৬ই জুন আন্তর্জাতিক গৃহকর্মী দিবস পালন করা হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর মাধ্যমে গৃহকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে আইনি স্বীকৃতিকে বাস্তব সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তাদের মতে, দেশে প্রায় ৪০ লাখ গৃহকর্মী পরিবার, সমাজ ও জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। কিন্তু অধিকাংশ গৃহকর্মী এখনও লিখিত নিয়োগপত্র, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, সামাজিক নিরাপত্তা ও শ্রমিক হিসেবে প্রাপ্য অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, “আন্তর্জাতিক গৃহকর্মী দিবসে আমরা গৃহকর্মীদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদার দাবির প্রতি সংহতি জানাই। শ্রম আইনে স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও এখন প্রয়োজন সংগঠিত শক্তি গড়ে তোলা। আমরা চাই প্রতিটি কলোনি ও এলাকায় গৃহকর্মীদের ইউনিয়ন গড়ে উঠুক।”
তিনি আরও বলেন, গৃহকর্মীদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রয়োজনীয় এসআরও জারি করে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সমাবেশ থেকে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা ২০১৫-এর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং শ্রম আইনের আওতায় গৃহকর্মীদের পূর্ণাঙ্গ অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
উত্থাপিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— গৃহকর্মীদের নিয়োগ, মজুরি, কর্মঘণ্টা ও ছুটিসহ সব শর্ত লিখিত চুক্তিপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তা বাধ্যতামূলক করা; কর্মসংস্থানের তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালু করা; কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, নির্যাতন বা মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে পৃথক আইনি কাঠামো ও তহবিল গঠন; এবং ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের পথ উন্মুক্ত করা।
এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ অভিযোগ গ্রহণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবিও জানানো হয়।
গৃহকর্মী জাতীয় ফোরাম–বাংলাদেশের সভাপতি জাকিয়া সুলতানা বলেন, “শ্রম আইনের স্বীকৃতিকে বাস্তব অধিকার ও সুরক্ষায় রূপান্তর করতে সরকার, নিয়োগকর্তা, শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
বক্তাদের মতে, একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য গৃহকর্মীদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।