রুড গুলিত: ফুটবল, প্রতিবাদ আর এক কৃষ্ণাঙ্গ স্বপ্নের গল্প

সোহেইল জাফর

ব্রাজিলের উত্তরে, লাতিন আমেরিকার ছোট্ট দেশ সুরিনাম। আয়তনে ব্রাজিলের তুলনায় অনেক ছোট হলেও বাংলাদেশের চেয়ে বড়। জনসংখ্যা মাত্র ছয় লাখ। এই দেশের ঘাসের মাঠে রবিনহুড ক্লাবের হয়ে স্ট্রাইকার পজিশনে খেলতেন হারম্যান। তাঁর তীক্ষ্ণ নৈপুণ্যে রবিনহুড একাধিকবার লীগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে গোটা লাতিন আমেরিকা ছিল উত্তাল। এক হাতে মাও সেতুংয়ের লাল বই, অন্য হাতে চে গুয়েভারার ‘গেরিলা ওয়ারফেয়ার’—তরুণদের এক বড় অংশ তখন বিপ্লবের স্বপ্নে উজ্জীবিত। সেই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল ফুটবলাঙ্গনেও।

রবিনহুড ক্লাবে হারম্যানের সতীর্থ ছিলেন জর্জ। দুই বন্ধু সুরিনাম জাতীয় দলের হয়েও মাঠে নেমেছিলেন। কিন্তু তখনকার সুরিনামের পরিবেশ ফুটবলের জন্য অনুকূল ছিল না।

১৯৫৪ সালে ডাচ উপনিবেশ থেকে স্বায়ত্তশাসন পায় সুরিনাম। কিন্তু প্রকৃত মুক্তি আসেনি। বিপ্লবীদের সন্ধানে সেখানে উপস্থিত হয় আমেরিকান সামরিক প্রভাব ও গোয়েন্দা তৎপরতা। তরুণদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, অভিযান চলছিল রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে।

সে বছর এবং পরের বছরও হারম্যানের খেলার জাদু দেখেছিল সুরিনাম। রবিনহুড চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কিন্তু ভালো খেলেও নিজের জীবন রক্ষার নিশ্চয়তা পাননি তিনি।

একজন কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের জন্য সুরিনামে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠেছিল। বামপন্থী চিন্তা আর কালো চামড়া—দুটোই যেন প্রাণঘাতী পরিচয়। এক গভীর রাতে বন্ধু জর্জকে নিয়ে একটি ভাঙা নৌকায় দেশ ছাড়েন হারম্যান। সাগর পাড়ি দিয়ে পৌঁছান ইউরোপের দেশ হল্যান্ডে।

হারম্যান ও জর্জ সেখানে গিয়ে জীবনসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু ফুটবলকে কখনো ছাড়েননি। হল্যান্ডের সেকেন্ড ডিভিশনে কিছুদিন খেলেছেন। নিজেদের জীবন যেমনই হোক, ছেলেদের ফুটবল শেখাতে ভোলেননি।

দুই দেশান্তরী বন্ধু হারম্যান রাইকার্ড ও জর্জ গুলিতের ঘরেই একই বছরে, একই মাসে জন্ম নেয় দুই ছেলে—ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড ও রুড গুলিত। পরবর্তীকালে তারা হয়ে ওঠেন গত শতাব্দীর সেরা দুই ফুটবলারের অন্যতম। একাধিকবার ব্যালন ডি’অরজয়ী রাইকার্ডকে ফিফা সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে রেখেছে।

আর রুড গুলিত? ফিফা কিংবা বিশ্বকাপ—প্রচলিত সাফল্যের মাপকাঠিকে তিনি কখনো জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মনে করেননি। ব্যালন ডি’অর জিতেছেন, তিনবার বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু বিশ্বকাপের আগে হঠাৎ দল ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্তও নিয়েছেন।

বাবার মতো তিনিও বামপন্থী রাজনৈতিক ভাবধারায় প্রভাবিত ছিলেন। ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড ছিলেন তুলনামূলকভাবে উদারপন্থী, কিন্তু ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম তাকেও বহুবার কমিউনিস্ট বলে আখ্যা দিয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ ছিল তাঁদের গায়ের রঙ। হল্যান্ডে কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর হিসেবে গুলিতকে লড়াই করতে হয়েছে পুরো সমাজের বিরুদ্ধে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমার বাবা-কাকাদের আগে কেউ কখনো এই মহাদেশে আসেনি। স্কুলে আমিই ছিলাম একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়।”

দুই বন্ধুর দুই পুত্র একই দেশে, একই সময়ে বড় হয়েছেন। প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে। পেশাদার ফুটবলেও তাঁদের অভিষেক হয় একই দিনে। তবে স্বভাব ও খেলার ধরনে দুজন ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাইকার্ড ছিলেন শান্ত, সংযত ও রক্ষণাত্মক; গুলিত ছিলেন তার উল্টো।

নেদারল্যান্ডসের বর্ণবাদী দর্শক ও সংবাদমাধ্যমের আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অনন্য ভাষা বেছে নেন রুড গুলিত।

তিনি নিজের মাথায় ধারণ করেন সুরিনামের ঐতিহ্যবাহী ড্রেডলকস—বিনুনি করা ঝাঁকড়া চুল। গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করেন, “আমি সুরিনামের এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক। আমার চুলই আমার মাথার মুকুট।”

শুধু চুল নয়, ফুটবলও তাঁর কাছে ছিল বর্ণবাদের বিরুদ্ধে, ইউরোপীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধের সংস্কৃতি।

ডাচ ফুটবলের চিরচেনা বৈশিষ্ট্য ‘টোটাল ফুটবল’। এর মূল দর্শন হলো—একজন খেলোয়াড় মাঠের যেকোনো জায়গায়, যেকোনো ভূমিকায় খেলতে পারবেন। ওয়েসলি স্নেইডার, রবিন ফন পার্সি কিংবা আরিয়েন রোবেন—ডাচ ফুটবলের এই ধারার উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু রুড গুলিত ছিলেন ভিন্ন মেরুর মানুষ।

৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার পেশিবহুল গড়ন। সেন্টার-ব্যাক থেকে স্ট্রাইকার, সুইপার থেকে আক্রমণভাগ—মাঠের প্রায় সব জায়গায় খেলতে পারতেন তিনি। লম্বা পা আর অসাধারণ গতিশীলতার কারণে মাঠের বিশাল অংশজুড়ে দেখা যেত তাঁকে। তাঁর ড্রিবলিং ও বল নিয়ন্ত্রণে বিভ্রান্ত হয়েছেন অসংখ্য প্রতিপক্ষ। একাই অনেক ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন।

অন্য অনেক খেলোয়াড়ের মতো চোট তাঁর ক্যারিয়ারকে গ্রাস করতে পারেনি। ডিফেন্ডারদের বারবার আক্রমণের লক্ষ্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন।

১৯৮৭ সালে জিতলেন ব্যালন ডি’অর। ১৯৮৮ সালে অধিনায়ক হিসেবে জিতলেন ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ। একই সময়ে ইতালিয়ান ক্লাব এসি মিলানের নেতৃত্ব দিয়ে জিতলেন ইউরোপিয়ান কাপ, যার বর্তমান নাম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। ফাইনালে তাঁর জোড়া গোল আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অম্লান।

ব্যালন ডি’অর হাতে নিয়ে তিনি যে কাজটি করেছিলেন, সেটিই তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। পুরস্কারটি উৎসর্গ করেন নেলসন ম্যান্ডেলাকে। তখন ইতালির অনেক মানুষই জানতেন না, ম্যান্ডেলা কে।

পরে গুলিত বলেছিলেন, “ম্যান্ডেলার সঙ্গে যখন দেখা হয়, তিনি আমাকে বলেছিলেন—আমি জেলে বসেই তোমার কথা শুনেছি। খুব ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ওরা হয়তো তোমাকেও শাস্তি দেবে।”

ব্যালন ডি’অর, ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ, ইউরোপিয়ান কাপ—সবই জিতলেন। এবার লক্ষ্য বিশ্বকাপ। কিন্তু ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হলো।

ম্যান্ডেলাকে নিয়ে তাঁর অবস্থানের পর ইউরোপে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। গুলিত হয়ে ওঠেন নিপীড়নবিরোধী মানুষের কণ্ঠস্বর। রাজপথের আন্দোলন থেকে বর্ণবাদবিরোধী কনসার্ট—সবখানেই ছিলেন তিনি। বর্ণবাদবিরোধী জার্সি পরে কনসার্টে গানও গেয়েছেন।

১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের ঠিক আগে কোচ ডিক অ্যাডভোকাটের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে তিনি হঠাৎ জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেন। ডাচ সংবাদপত্রগুলো তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে আখ্যা দেয়। কিন্তু গুলিত স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, “ফুটবল মানে আনুগত্য নয়, ন্যায্যতা।”

আজও ডাচ ফুটবলসমাজ তাঁকে নিয়ে বিভক্ত। কেউ তাঁকে ভণ্ড বলেন, কেউ মনে করেন বিশ্বের সবচেয়ে নীতিনিষ্ঠ খেলোয়াড়দের একজন। রুড গুলিতের মতো করে ‘না’ বলার সাহস খুব কম মানুষই দেখিয়েছেন।

১৯৯৫ সালে তিনি দায়িত্ব নেন ইংলিশ ক্লাব চেলসির। বিস্মৃতপ্রায় এক ক্লাবকে নতুন পরিচয় দেন। দীর্ঘ ২৮ বছর পর বড় শিরোপার স্বাদ পায় চেলসি। অনেকের মতে, আজকের চেলসির উত্থানের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল গুলিতের সময়েই।

চেলসিতে তিনি ছিলেন খেলোয়াড়, অধিনায়ক, কোচ ও ম্যানেজার—সব ভূমিকায়। ফুটবল ইতিহাসে এমন উদাহরণ বিরল। তবে ক্লাব ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হয়। যেসব খেলোয়াড়কে দলে নিতে কর্তৃপক্ষ আগ্রহী ছিল, তাঁদের বিষয়ে গুলিত একমত ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডও ছাড়তে হয় তাঁকে।

ফুটবলকে তিনি পরিণত করেছিলেন সাম্যের ভাষায়। কেউ তাঁকে কমিউনিস্ট বলেছেন, কেউ রাজনৈতিক কর্মী। মাওয়ের লাল বই কিংবা মার্কাস গারভির কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদ—যাই তাঁকে অনুপ্রাণিত করে থাকুক না কেন, তাঁর স্বপ্ন ছিল সহজ—মানুষ থাকবে সবার ওপরে, ধর্ম-বর্ণের বিভাজনের ঊর্ধ্বে।

নিজের বিনুনি করা ঝাঁকড়া চুল নিয়ে গুলিত বলেছিলেন, “সুরিনামের কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের এই মাথার মুকুট নিয়ে আমি আমার মতো করে জীবনযাপন করতে চাই।”

স্বপ্নটা ছিল খুব ছোট। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায়, সেই সামান্য মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য, একটি ফুলকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তিনি আজীবন লড়াই করে গেছেন।

পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি, নেইমার কিংবা রোনালদো নন—আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড় রুড গুলিত। তাঁর কাছে ফুটবল ছিল প্রতিবাদের মঞ্চ। সমাজের অনিয়ম, বৈষম্য, বর্ণবাদ ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে তিনি লড়েছেন হাতে গিটার আর পায়ে ফুটবল নিয়ে।

জোয়াকিম ক্লেমেন্ট বলছেন, এবার নেদারল্যান্ডস চ্যাম্পিয়ন হতে পারে। ১৯৯৪ সালেও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু গুলিতের বিদায়ের পর দল এলোমেলো হয়ে যায়। এবার আবার সুযোগ এসেছে। বর্তমান দলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় আছেন, যাঁদের অনেকের শিকড় সুরিনামে। সেই অর্থে গুলিতের উত্তরাধিকার আজও বেঁচে আছে নেদারল্যান্ডস ফুটবলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *