১৪ জুন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কিংবদন্তি বৈমানিক গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম (অব.)-এর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর বীরত্ব, পেশাগত দক্ষতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা আজও বিমান বাহিনীর সদস্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম ছিলেন বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য সামরিক বৈমানিক। তিনি বাংলাদেশ, জর্ডান, ইরাক ও পাকিস্তান—এই চার দেশের বিমান বাহিনীতে দায়িত্ব পালনের বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেন। সামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে এমন নজির আর নেই।
তাঁর পেশাগত জীবনের শুরু পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে। দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কম্ব্যাট কমান্ডার্স ট্রেনিং স্কুলে প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হন। সেখানে তিনি সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করে ‘টপ গান’ উপাধি পান। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে দুঃসাহসিক আক্রমণ পরিচালনার জন্য তাঁকে পাকিস্তানের ‘সিতার-ই-জুরাত’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ তাঁর জীবনের আরেকটি গৌরবময় অধ্যায়। যুদ্ধের সূচনালগ্নে তিনি জর্ডানের মাফরাক বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করেন। আকাশযুদ্ধে তিনি ইসরাইলি একটি সুপার মিস্টেয়ার যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেন এবং আরেকটি ক্ষতিগ্রস্ত করেন। এই বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য জর্ডান সরকার তাঁকে ‘ওয়াসাম-আল-ইস্তিকলাল’ খেতাবে সম্মানিত করে।
পরবর্তীতে জর্ডান কর্তৃপক্ষ বৈমানিকদের ইরাকে পাঠালে সাইফুল আজম ইরাক বিমান বাহিনীর হয়ে যুদ্ধে অংশ নেন। সেখানে তিনি ইসরাইলের একটি Mirage III এবং একটি Vautour IIA যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেন। তাঁর অসাধারণ যুদ্ধদক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ ইরাক সরকার তাঁকে ‘নওত-আল শুজা’ উপাধিতে ভূষিত করে।
বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে তিনি একমাত্র বৈমানিক, যিনি তিনটি ভিন্ন দেশের সামরিক খেতাব লাভ করেন। এটি একটি বিশ্ব রেকর্ড হিসেবেও স্বীকৃত।
২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে বিশ্বের সেরা যুদ্ধবিমান বৈমানিকদের অন্যতম হিসেবে ‘লিভিং ঈগল’ উপাধিতে সম্মানিত করে। বিশ্বের মাত্র ২২ জন বৈমানিক এই মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি পেয়েছেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে তিনি দেশে ফিরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। বিমান বাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৭৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তবে অবসরের পরও তিনি তরুণ বৈমানিকদের জন্য ছিলেন এক জীবন্ত প্রেরণা।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী আজ তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে এই বীর সন্তানকে স্মরণ করছে। তাঁর বীরত্বগাথা শুধু বিমান বাহিনীর নয়, পুরো বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাসের অংশ।