মরক্কোর বিপক্ষে ড্র দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেছে ব্রাজিল। ফলাফল হিসেবে এটি খুব খারাপ না হলেও মাঠের খেলায় বেশ কিছু দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মিডফিল্ড, ট্রানজিশন এবং আক্রমণভাগের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ম্যাচের প্রথমার্ধে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মিডফিল্ড। সহজ পাসেও ভুল করেছে খেলোয়াড়রা। মাঝমাঠের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে বারবার বল হারানোর সুযোগ কাজে লাগিয়েছে মরক্কো। ম্যাচের প্রথম ১২ মিনিটেই ব্রাজিল যেখানে মাত্র একবার গোলমুখে আক্রমণ গড়তে পেরেছে, সেখানে মরক্কো ছয়বার ব্রাজিলের পোস্টের দিকে আক্রমণ চালায়।
প্রথম ৪০ মিনিটে ব্রাজিলের মিডফিল্ড থেকে কার্যকর কোনো ডায়াগোনাল পাস বা দ্রুত দিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। ফলে মরক্কোর সুশৃঙ্খল মিড ব্লক ভাঙতে ব্যর্থ হয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। দ্রুত বল আদান-প্রদান, পজিশন পরিবর্তন এবং সৃজনশীলতার ঘাটতি পুরো প্রথমার্ধজুড়েই চোখে পড়েছে।
মরক্কোর আক্রমণের বড় ভরসা ছিল ডান প্রান্তে আক্রমণাত্মক ফুলব্যাক আশরাফ হাকিমি ও ব্রাহিম দিয়াজের সমন্বয়। সেটি ঠেকাতে ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি বাম প্রান্তে অতিরিক্ত খেলোয়াড় নিয়ে চাপ তৈরির কৌশল বেছে নেন।
তবে এই পরিকল্পনা সফল করতে ডান পাশে একজন কার্যকর উইঙ্গার এবং দ্রুত সুইচ অব প্লে প্রয়োজন ছিল। সেই ঘাটতির কারণেই ম্যাচের প্রায় ৩০ মিনিট পর রাফিনিয়াকে ডান প্রান্তে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবুও আক্রমণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।
স্ট্রাইকার ইগর থিয়াগোর পারফরম্যান্সও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষের বক্সে তার স্পর্শ ছিল মাত্র একবার। পাঁচটি দ্বৈরথের মধ্যে তিনি জিতেছেন মাত্র দুটি।
৬২ মিনিটে মাঠ ছাড়ার আগে দুটি বড় সুযোগ নষ্ট করেন তিনি। বল ধরে রাখা, সতীর্থদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা কিংবা আক্রমণ গঠনে নিচে নেমে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রেও তাকে কার্যকর দেখা যায়নি।
বল দখলে না থাকলেও মরক্কো ছিল বেশি সংগঠিত ও গতিময়। ব্রাজিল বল হারানোর পর দ্রুত নিজেদের রক্ষণাত্মক অবস্থানে ফিরতে পারেনি। কাউন্টার প্রেসিংয়েও ছিল ধীরগতি।
অন্যদিকে মরক্কো প্রায় পুরো দল নিয়ে রক্ষণ সামলালেও ব্রাজিলের ডিফেন্সিভ সংগঠন ছিল ঢিলেঢালা। এর ফলে ব্রাজিলের ফুলব্যাকদের একাধিকবার এক বনাম এক পরিস্থিতিতে পরাস্ত করে সুযোগ তৈরি করেছে মরক্কোর আক্রমণভাগ।
ম্যাচে ব্রাজিলের অন্যতম দুর্বল দিক ছিল ট্রানজিশন। বিশেষ করে ডিফেন্সিভ ট্রানজিশনে দলটি ছিল অগোছালো। শারীরিকভাবে শক্তিশালী মরক্কোর বিপক্ষে মাঝমাঠের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়েছে ব্রাজিল।
মরক্কো বল জয়ের পর বারবার ব্রাজিলের মিডফিল্ডের কম্প্যাক্টনেসের অভাব চোখে পড়ে। কয়েকটি মুহূর্তে পুরো ব্যাকলাইনই উন্মুক্ত হয়ে যায়, যা বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আরও বিপজ্জনক হতে পারে।
ওয়েলসলির ইনজুরির কারণে ব্রাজিলের দলে কার্যকর আক্রমণাত্মক ফুলব্যাকের অভাব স্পষ্ট হয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে দলটি অনেকটা সমতল ব্যাক ফোর নিয়ে খেলেছে। ফলে উইংয়ে আক্রমণ গড়ে তুললেও পর্যাপ্ত ওভারল্যাপ বা অতিরিক্ত সমর্থন পাওয়া যায়নি।
মরক্কো সহজেই দুইজন খেলোয়াড় দিয়ে ব্রাজিলের উইঙ্গারদের চাপে ফেলেছে। এর ফলে দুই প্রান্ত থেকেই আক্রমণের কার্যকারিতা প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
ম্যাচ শেষে ব্রাজিল শিবিরের সামনে বেশ কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো এদেরসনকে ডান প্রান্তের রক্ষণভাগে ব্যবহার করা হবে কি না। পাশাপাশি রাফিনিয়ার ভূমিকা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হতে পারে কোচিং স্টাফকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সৃজনশীলতার ঘাটতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ব্রাজিল। এই ম্যাচ আবারও দেখিয়েছে, আক্রমণ সাজানোর ক্ষেত্রে নেইমারের বিকল্প এখনো পুরোপুরি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তবে টুর্নামেন্টের শুরুতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ড্রকে পুরোপুরি নেতিবাচক বলা যাবে না। কিন্তু পরের ম্যাচে হাইতির মুখোমুখি হওয়ার আগে ব্রাজিলকে নিজেদের খেলার ধরন নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে।