বাংলাদেশে বিশ্বকাপ উন্মাদনা

বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে দুই দল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকা, জার্সি এবং পোস্টার দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামীণ এলাকায় দৃশ্যমান। নিজের দেশ যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলেও রাস্তায় রাস্তায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকার লড়াই চলছে। এই উন্মাদনা উৎসবের পাশাপাশি সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটাচ্ছে।

বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই সমর্থন অনেক ক্ষেত্রে আবেগপূর্ণ এবং প্রতিযোগিতামূলক রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তা শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। ১৯৬০-৭০ এর দশকে পেলের ব্রাজিল দল তরুণ প্রজন্মের আইকন হয়ে ওঠে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে টেলিভিশনে ম্যারাডোনার খেলা দেখে নতুন প্রজন্ম আর্জেন্টিনার প্রতি আকৃষ্ট হয়। বর্তমানে লিওনেল মেসি সেই আবেগ ধরে রেখেছেন।

ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরের ক্রীড়া সামগ্রী বাজারে স্বল্পমূল্যের রেপ্লিকা জার্সি বিক্রি হচ্ছে। অনেক এলাকায় বাড়ি, দোকান ও দেয়ালে খেলোয়াড়দের বড় কাট-আউটও দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দুই দলের সমর্থকদের সক্রিয়তা বাড়ে বিশ্বকাপের সময়।

স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ঘটনায় সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের খবরও পাওয়া যায়। কিছু ঘটনায় আহত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই ভালোবাসা প্রায়ই সহিংস রূপ নেয়। হবিগঞ্জের কাশিপুরে স্থানীয় ফুটবল ম্যাচের পর ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সংঘর্ষে ২৫ থেকে ৫০ জন আহত হয়েছেন।

২০২২ বিশ্বকাপে দেখা গেছে, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সংঘর্ষ ও উন্মাদনায় ২৩ জন মারা গেছেন। ৩৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৪৫ জন আহত হয়েছেন। অনেক মৃত্যু হয়েছে পতাকা টাঙাতে গিয়ে পড়ে যাওয়া বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে।

২০১৪ সালে অন্তত তিনজন বিদ্যুতের তারে পতাকা টাঙাতে গিয়ে মারা যান। ২০১৮ সালে ১২ বছরের এক শিশু ব্রাজিলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়।

এই ধরনের পরিস্থিতি অনেক সময় খেলাকে ছাড়িয়ে সামাজিক উত্তেজনায় রূপ নেয়, বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যে।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার এই দ্বৈরথের মাঝে অন্যান্য দলও বাংলাদেশের সমর্থকদের আকর্ষণের চেষ্টা করছে। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়ে তাদের দূতাবাসের সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশের জনগণকে নরওয়ে ফুটবল দলকে সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছে — স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে নরওয়ে ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে দ্রুত স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর একটি। মাগুড়ার ৭২ বছর বয়সী আমজাদ হোসেন নিজের জমি বিক্রি করে ৭.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মান পতাকা তৈরি করেছেন, তিনি এটা জার্মানির কোনো জাদুঘরে স্থান পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

বাংলাদেশে ফুটবল মূলত একটি আবেগনির্ভর সামাজিক চর্চা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিজেদের দল বিশ্বকাপে না থাকলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ কমেনি। তবে এই আবেগ কখনও কখনও অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে নিয়ে যায় বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।

ফুটবল সমর্থনকে নিরাপদ ও উৎসবমুখর রাখতে সচেতনতা জরুরি। একই সঙ্গে জনসমাগম, পতাকা টাঙানো বা উদযাপনের সময় নিরাপত্তা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবল এখন শুধু খেলা নয়। এটি সামাজিক পরিচয়, আবেগ এবং দলীয় সমর্থনের এক জটিল মিশ্র বাস্তবতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *