বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনের আগেই বদলাতে হলো হাইতির জাতীয় দলের জার্সি। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি বহন করা নকশা পরিবর্তন করতে হয়েছে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার আপত্তির কারণে। প্রশ্ন উঠেছে—খেলার মঞ্চ কি পুরোপুরি রাজনীতি ও ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব?
হাইতির ক্রীড়া সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সায়েটা জানিয়েছে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে তৈরি করা জার্সির নকশায় দেশের ইতিহাস, সংগ্রাম ও মানুষের আত্মপরিচয়কে তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে ছিল ১৮০৩ সালের ঐতিহাসিক ভার্তিয়েরেস যুদ্ধের প্রতীকী উপস্থাপন। এই যুদ্ধকে হাইতির স্বাধীনতার পথ নির্ধারণকারী ঘটনা হিসেবে দেখা হয়।
ইতিহাস বলছে, হাইতি বিশ্বের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রজাতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ দাসপ্রথা ও উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পর দেশটি ফরাসি শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। স্বাধীনতার সেই লড়াইয়ের শেষ বড় সামরিক অধ্যায় ছিল ভার্তিয়েরেসের যুদ্ধ। পরবর্তীতে ১৮০৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে হাইতি।
তবে ফিফা মনে করেছে, জার্সির কিছু দৃশ্যমান উপাদান তাদের সরঞ্জামবিষয়ক নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। সংস্থাটির নিয়ম অনুযায়ী, খেলোয়াড়দের পোশাকে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত বার্তা বহন করা যাবে না। সেই ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই জার্সির নকশা পরিবর্তনের অনুরোধ জানানো হয়। পরে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সংশোধিত নকশা অনুমোদনের জন্য জমা দেয়।
হাইতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করা ছিল না। বরং এটি ছিল জাতীয় ইতিহাস ও জনগণের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রয়াস। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জার্সির মূল সংস্করণ ইতোমধ্যে সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছিল।
এই ঘটনা আবারও পুরোনো এক বিতর্ক সামনে এনেছে—জাতীয় ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম বা সাংস্কৃতিক স্মৃতি কি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব? নাকি বৈশ্বিক ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ এমন এক মানদণ্ড তৈরি করছে, যেখানে ইতিহাসও কখনও কখনও ‘রাজনৈতিক’ হিসেবে ব্যাখ্যা পায়?
বিশ্বকাপের উদ্বোধনের আগের এই বিতর্ক ফুটবলের বাইরেও আরেকটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে—খেলার জার্সি কি শুধু পোশাক, নাকি একটি দেশের স্মৃতি, পরিচয় ও ইতিহাসেরও বাহক?