২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার ১৬টি শহরে বসবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর। মাঠে ৪৮টি দল শিরোপার জন্য লড়বে, কিন্তু মাঠের বাইরে চলবে আরও বড় এক প্রতিযোগিতা—অর্থনীতির প্রতিযোগিতা।
বিশ্বকাপ মানেই কোটি কোটি দর্শক, লাখ লাখ পর্যটক এবং বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। তবে এত বড় আয়োজন থেকে আসলে কে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়? আয়োজক দেশগুলো, স্থানীয় ব্যবসা, নাকি ফিফা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন অর্থনীতিবিদরা।
২০২৬ বিশ্বকাপ হবে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। তিনটি দেশ, ১৬টি শহর, ৪৮টি দল এবং ১০৪টি ম্যাচ নিয়ে এটি নতুন রেকর্ড গড়বে।
বিশ্লেষকদের হিসাবে, পুরো টুর্নামেন্ট ঘিরে মোট অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পরিমাণ হবে প্রায় ১৩.৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেই ব্যয় হবে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার। পর্যটকদের ব্যয় ধরা হয়েছে ৭.৫ বিলিয়ন ডলার এবং ফিফার নিজস্ব বাজেট প্রায় ২.৯ বিলিয়ন ডলার।
সংখ্যাগুলো বিশাল হলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অর্থের সবটাই নতুন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপ নেয় না।
বিশ্বকাপ নিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা হলো, এমন বড় আয়োজন দেশের অর্থনীতিকে বদলে দেয়। কিন্তু বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন।
ন্যাটিক্স কর্পোরেট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিংয়ের গবেষণা বলছে, মেক্সিকোর অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারে। দেশটির জিডিপি ০.১ থেকে ০.২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
অন্যদিকে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য প্রভাব মাত্র ০.০৫ শতাংশ। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির আকার এত বড় যে বিশ্বকাপের মতো একটি আসরও সামগ্রিক অর্থনীতিতে খুব বড় পরিবর্তন আনতে পারে না।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক সুবিধা সাধারণত স্বল্পমেয়াদি এবং সীমিত।
২০২৬ বিশ্বকাপের মূল কেন্দ্র হবে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ১১টি শহরে অনুষ্ঠিত হবে ৭৮টি ম্যাচ। তবে এখানেই রয়েছে একটি অর্থনৈতিক বৈপরীত্য। সবচেয়ে বেশি ম্যাচ আয়োজন করলেও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব তুলনামূলক কম। এর প্রধান কারণ হলো, অধিকাংশ স্টেডিয়াম, বিমানবন্দর, সড়ক ও হোটেল আগে থেকেই তৈরি। ফলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। এছাড়া অনেক নিয়মিত পর্যটক বিশ্বকাপের ভিড় এড়িয়ে অন্য সময় ভ্রমণ করতে পারেন।
তবে নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি অঞ্চল ব্যতিক্রম। ফাইনাল ম্যাচ আয়োজনের কারণে সেখানে প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হতে পারে। স্থানীয়ভাবে ২৬ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান এবং ১২ লাখ পর্যটক আগমনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক লাভের বিচারে মেক্সিকোকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটি ১৩টি ম্যাচ আয়োজন করবে। উদ্বোধনী ম্যাচ হবে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে। পর্যটন খাতের ওপর মেক্সিকোর নির্ভরতা তুলনামূলক বেশি। আন্তর্জাতিক দর্শকদের ব্যয় সরাসরি স্থানীয় ব্যবসা, হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং পরিবহন খাতে প্রভাব ফেলবে। ফলে বিশ্বকাপের অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে দ্রুত প্রবাহিত হবে।
কানাডার টরন্টো ও ভ্যানকুভার শহরে বিশ্বকাপের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু আয়োজন ব্যয় নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দুই শহরে বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য ব্যয় ১ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের বেশি হতে পারে। সমর্থকদের আশা, পর্যটন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মাধ্যমে এই অর্থের একটি বড় অংশ ফিরে আসবে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, শেষ পর্যন্ত এই ব্যয়ের বোঝা কতটা করদাতাদের ওপর পড়বে।
বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝার জন্য লস অ্যাঞ্জেলেসের উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে আটটি ম্যাচ আয়োজন থেকে প্রায় ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সরাসরি ব্যয় ৩৪৩ মিলিয়ন ডলার এবং পরোক্ষ বা অনুসরণ প্রভাব ২৫১ মিলিয়ন ডলার।
শুধু কর রাজস্ব থেকেই স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য সরকার কয়েক কোটি ডলার আয় করতে পারে। এছাড়া শ্রমবাজারে অতিরিক্ত ২৪৩ মিলিয়ন ডলার বেতন প্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একজন দর্শক গড়ে প্রায় ২,৩৫০ ডলার ব্যয় করতে পারেন, যার বড় অংশ যাবে আবাসন খাতে।
বিশ্বকাপ মানেই পর্যটকদের ঢল—এমন ধারণা সব সময় সত্যি হয় না।
আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ আয়োজক শহরে হোটেল বুকিং প্রত্যাশার চেয়ে কম। প্রায় ৮০ শতাংশ শহরই পূর্বাভাসের নিচে রয়েছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা পাওয়ার জটিলতা, উচ্চ বিমান ভাড়া, বাড়তি ভ্রমণ ব্যয় এবং কঠোর সীমান্ত নীতি অনেক সম্ভাব্য দর্শককে নিরুৎসাহিত করছে।
তবে মিয়ামি শহর ব্যতিক্রম। সেখানে বুকিং প্রত্যাশার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
বিশ্বকাপ থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় সাধারণত বেসরকারি খাত। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, খুচরা বিক্রি এবং বিনোদন খাত সরাসরি উপকৃত হয়। স্থানীয় ব্যবসাগুলোর বিক্রি বেড়ে যায়।
সবচেয়ে বড় বিজয়ীদের একজন হলো ফিফা। সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি এবং মার্চেন্ডাইজিং থেকে সংস্থাটি বিলিয়ন ডলার আয় করে।
মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোও বড় সুবিধা পায়। বিশ্বকাপকে ঘিরে বিজ্ঞাপন আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
সমালোচকদের মতে, আয়োজক দেশগুলোর সরকার অনেক সময় বড় ব্যয় বহন করে, কিন্তু সরাসরি লাভের বড় অংশ চলে যায় বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে। করদাতাদের অর্থে নিরাপত্তা, পরিবহন ও জনসেবার ব্যয় মেটানো হয়। একই সঙ্গে হোটেল ভাড়া ও বিমান ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় নিয়মিত পর্যটকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লাভ হয়তো অর্থনৈতিক নয়। বড় ক্রীড়া আসর একটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করতে পারে। ২০০৬ সালে জার্মানির বিশ্বকাপ আয়োজনের পর দেশটির বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। কাতারও ২০২২ বিশ্বকাপকে দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্বকাপ কোনো দেশের অর্থনীতিকে রাতারাতি বদলে দেয় না। তবে এটি একটি দেশকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে।
ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু গোল, ট্রফি আর উৎসবের গল্প নয়। এটি বিলিয়ন ডলারের এক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রকল্প।
২০২৬ বিশ্বকাপে লাখো দর্শক, হাজারো ব্যবসা এবং অসংখ্য প্রতিষ্ঠান লাভের হিসাব কষছে। কিন্তু সব পক্ষ সমানভাবে লাভবান হবে না। ফিফা ও বেসরকারি খাত যেখানে বড় আয় করবে, সেখানে সরকারগুলোকে বহন করতে হবে আয়োজনের বড় অংশের খরচ।
তাই বিশ্বকাপের প্রকৃত প্রশ্ন শুধু কে চ্যাম্পিয়ন হবে তা নয়; বরং এই বিলিয়ন ডলারের খেলায় শেষ পর্যন্ত কে জিতবে, আর কে খরচের বোঝা বহন করবে।