টিকটক থেকে মানবপাচার: জনপ্রিয়তার ফাঁদে তরুণ-তরুণীদের ঝুঁকি কতটা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক তরুণ-তরুণীর জীবনে নতুন সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে তৈরি করছে নতুন ধরনের ঝুঁকিও। মানবপাচার, প্রতারণা, যৌন শোষণ এবং অনলাইন ব্ল্যাকমেইলের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা।

মানবপাচারবিরোধী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যৌন শোষণের শিকার হওয়া বহু নারী ও কিশোরী প্রথমে প্রেম, বিয়ে বা চাকরির প্রলোভনে ঘর ছাড়েন। পরে তারা নিজেদের আবিষ্কার করেন এমন এক পরিস্থিতিতে, যেখান থেকে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তি, প্রেমিক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা সম্পর্কই পাচারের সূচনা ঘটায়।

টিকটক, লাইকি, বিগো লাইভ, ট্যাংগোসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম তরুণদের কাছে বিনোদন ও আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। তবে এসব প্ল্যাটফর্মে দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার প্রবণতা অনেককে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কে জড়াতে উৎসাহিত করতে পারে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের একটি অংশ লাইক, ফলোয়ার ও সামাজিক স্বীকৃতির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচিতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু যখন সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, শিক্ষা বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, তখন প্রতারক চক্রের জন্য সুযোগ তৈরি হয়।

সাইবার অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিমভাবে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর একটি বাজারও তৈরি হয়েছে। অর্থের বিনিময়ে ভুয়া ফলোয়ার, লাইক ও মন্তব্য সংগ্রহ করা যায়। এর ফলে অনেক নতুন ব্যবহারকারী কোনো অ্যাকাউন্টকে বাস্তবের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় মনে করে তার প্রতি আকৃষ্ট হন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপ, অনলাইন বন্ধুত্ব এবং অফলাইন আড্ডা বা ‘হ্যাংআউট’ অনেক সময় অপরাধের সূত্রপাত ঘটায়। এসব ক্ষেত্রে মাদক ব্যবহার, ব্ল্যাকমেইল, যৌন নিপীড়ন বা পাচারের অভিযোগও সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে কয়েকটি আলোচিত ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে অপরাধ সংঘটনের তথ্য পাওয়া গেছে।

মানবপাচারবিরোধী কর্মীরা বলছেন, ঝুঁকি শুধু মেয়েদের জন্য নয়। ছেলেরাও বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা ও পাচারচক্রের শিকার হচ্ছে। বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি, ব্যবসার সুযোগ বা ধর্মীয় ও আদর্শিক উদ্দেশ্যের কথা বলে তরুণদের বিভিন্ন দেশে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ বহুবার উঠেছে। পরে তাদের অনেকে শ্রম শোষণ, জোরপূর্বক কাজ বা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি, একাকীত্ব, অনলাইন আসক্তি এবং ঝুঁকি সম্পর্কে অজ্ঞতা তরুণদের আরও দুর্বল করে তোলে। তাই কেবল আইন প্রয়োগ নয়, সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি।

তাই অভিভাবকদের সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজ রাখা জরুরী। একই সঙ্গে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ, বিদেশে চাকরির প্রস্তাব বা অনলাইনে গড়ে ওঠা সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তি নিজে ঝুঁকি নয়। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা না থাকলে জনপ্রিয়তার স্বপ্ন কখনও কখনও প্রতারণা, শোষণ কিংবা মানবপাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধের দরজা খুলে দিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *