শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ভূ-রাজনীতি: যখন ঠান্ডা হাওয়া হয়ে ওঠে কূটনৈতিক অস্ত্র

 

২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ভারতের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। নয়াদিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই—সব শহরেই মানুষজন একই প্রশ্ন করছে: “এসি পাওয়া যাবে?” কিন্তু এই সাধারণ প্রশ্নের পেছনে লুকিয়ে আছে একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ, যেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এয়ার কন্ডিশনার) আর শুধু একটি গৃহস্থালি যন্ত্র নয়—এটি হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক শক্তির লড়াইয়ের অন্যতম মঞ্চ।

দ্য ইকনোমিস্ট-এর সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, কীভাবে চরম তাপদাহ রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করছে—ফ্রান্সের সুপারমার্কেট দাঙ্গা থেকে দক্ষিণ এশিয়ার লোডশেডিং নিয়ে বিক্ষোভ পর্যন্ত। কিন্তু এই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে ভারত, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ত্রিমুখী লড়াই, বিজয়ী নির্ধারণ করবে কে নিয়ন্ত্রণ করবে ভবিষ্যতের শীতল বিশ্ব।

২০২৬ সালের গ্রীষ্ম ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত গ্রীষ্মগুলোর একটি। ভারতীয় আবহাওয়া দফতর সতর্ক করেছে যে পূর্ব, মধ্য এবং উত্তরপশ্চিম ভারতে জুন পর্যন্ত দিনের বেলায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপপ্রবাহ থাকবে। ২০২৪ সাল বিশ্ব এবং ভারত উভয় জায়গাতেই সবচেয়ে গরম বছর ছিল, যেখানে বেশি তাপপ্রহারের কারণে ৭০০-এর বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

ভারতে কয়েক বছর ধরেই তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ছে। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে। ফলে এসির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

শিল্প সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বছরে প্রায় দেড় কোটি এসি বিক্রি হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে।

কিন্তু বড় সমস্যা উৎপাদনে।

একটি এসির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কম্প্রেসার। এটিকেই এসির ‘হৃদপিণ্ড’ বলা হয়। ভারতের বার্ষিক কম্প্রেসারের চাহিদা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ইউনিট। অথচ দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র ৫৫ থেকে ৬০ লাখ ইউনিট।

অর্থাৎ দেশের অধিকাংশ চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে। এবং এই আমদানির প্রায় ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ আসে চীন থেকে। ইনভার্টার প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা আরও বেশি।

গুয়াংডং মেইঝি (জিএমসিসি), হাইলি গ্রুপ, হাইরি এবং চ্যাংহং হুয়াই-এর মতো চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতীয় বাজারে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। ফলে ভারতীয় বাজারে এসির চাহিদা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে চীনের ওপর প্রযুক্তিগত নির্ভরতা।

এই নির্ভরতা কমাতে ভারত সরকার ২০২৬ সালে নতুন আমদানি নীতি চালু করেছে।

দুই টনের নিচের এসি কম্প্রেসার আমদানির ওপর কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। লক্ষ্য একটাই—বিদেশি কোম্পানিগুলোকে ভারতে উৎপাদন কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করা এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো।

এটি মূলত “মেক ইন ইন্ডিয়া” কর্মসূচির অংশ। তবে শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার আগে আমদানি সীমিত করলে সরবরাহ সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

চীনা গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস এই নীতিকে “ভারতের নিজের ভোক্তাদের ক্ষতি” বলে আখ্যা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “শিল্প উন্নয়ন কখনোই প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অর্জন করা যায় না। এটি উন্নত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত দক্ষ জনশক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এর উপর নির্ভরশীল।”

চীনা বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভারত —প্রথমে এক বছরের জন্য আমদানি শিথিল করে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে প্রবেশ করতে দেওয়া, তারপর কোটা কমিয়ে তাদের ভারতে কারখানা স্থাপনে বাধ্য করার পুরনো কৌশল ব্যবহার করছে। কিন্তু চীন এখন প্রযুক্তি রপ্তানিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যা এই কৌশলের সফলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

চীনের শক্তি শুধু উৎপাদনে নয়, প্রযুক্তিতেও। উচ্চ দক্ষতার মোটর, উন্নত ইনভার্টার কম্প্রেসার এবং রেয়ার-আর্থ প্রযুক্তিতে চীনের দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ রয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ এসি উৎপাদন হয় চীনে। দেশটি বছরে কয়েকশ মিলিয়ন ইউনিট উৎপাদন ও রপ্তানি করে।

ভারতের তুলনায় চীনা পণ্যের উৎপাদন সস্তা, দ্রুত এবং অধিক শক্তিশালী। এ কারণেই শুধু আমদানি সীমিত করলেই প্রযুক্তিগত ব্যবধান দ্রুত কমানো সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০২৫ সালের আগস্টে, ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের উপর ৫০% ট্যারিফ আরোপ করে—২৫% পারস্পরিক ট্যারিফ এবং ২৫% রাশিয়ান তেল ক্রয়ের জন্য শাস্তিমূলক ট্যারিফ। এই চাপ ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য বিপর্যয়কর ছিল।

তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত ২৫% ট্যারিফ প্রত্যাহার করে, এবং ভারত প্রতিশ্রুতি দেয় রাশিয়ান তেল আমদানি বন্ধ করবে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াবে।

কিন্তু এই চুক্তির মধ্যেও এসি শিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞজ তৈরি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২৬ সালের জুনে বাসস্থানের HVAC সরঞ্জামের জন্য সেকশন ২৩২ ট্যারিফ ২৫% থেকে ১৫% কমিয়ে আনে—কিন্তু বাণিজ্যিক HVAC এর জন্য এই ছাড় প্রযোজ্য নয়। এটি ভারতীয় এসি প্রস্তুতকারকদের জন্য একটি জটিল পরিবেশ তৈরি করেছে।

ভারত অবশ্য হাত গুটিয়ে বসে নেই।

প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ (পিএলআই) কর্মসূচির আওতায় দেশীয় উৎপাদনে হাজার হাজার কোটি রুপির বিনিয়োগ হচ্ছে।

এলজি ইলেকট্রনিক্স, মিতসুবিশি ইলেকট্রিক, ডাইকিন এবং পিজি ইলেক্ট্রোপ্লাস্ট-এর মতো প্রতিষ্ঠান ভারতে নতুন কম্প্রেসার কারখানা নির্মাণ করছে। বিশেষ করে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রী সিটি দ্রুত ভারতের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ শিল্পের অন্যতম উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।

সরকারের লক্ষ্য, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কম্প্রেসার উৎপাদনে বিদেশি নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা।

বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা যত বাড়বে, এসির চাহিদাও তত বাড়বে। এর অর্থ শুধু বেশি বিক্রি নয়। এর অর্থ বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, কাঁচামাল, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং শিল্পনীতির ওপর নতুন প্রতিযোগিতা।

আজকের দিনে একটি কম্প্রেসার শুধু যন্ত্রাংশ নয়। এটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রতীক। একটি এসি শুধু ভোক্তা পণ্য নয়। এটি এখন জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পনীতি এবং বৈশ্বিক কূটনীতির অংশ।

ফ্রান্সে তাপদাহের সময় সুপারমার্কেটে দাঙ্গা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় লোডশেডিং-এর কারণে বিক্ষোভ দেখিয়েছে যে, শীতলতা আর শুধু আরাম নয়—এটি হয়ে উঠেছে একটি অধিকার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম) ২০২৮ সাল থেকে আরও ১৮০টি পণ্যের উপর কর আরোপের পরিকল্পনা করছে, যা এসি শিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞজ তৈরি করবে।

চীন বিশ্বের বৃহত্তম এসি উৎপাদনকারী দেশ, যারা বিশ্ব বাজারের ৪০% দখল করে আছে। দেশটি বার্ষিক ১০০ মিলিয়ন ইউনিট দেশীয়ভাবে ব্যবহার করে এবং ২০০ মিলিয়ন ইউনিট রপ্তানি করে। প্রযুক্তি, স্কেল এবং মান—তিন দিকেই চীনের অবস্থান অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এসি আমদানির বড় বাজার, যেখানে মেক্সিকো, চীন এবং থাইল্যান্ড প্রধান সরবরাহকারী। ট্রাম্পের ট্যারিফ নীতি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে পুনর্বিন্যাস করছে, কিন্তু এর ফলে ভারত সরাসরি উপকৃত হচ্ছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ভারতের জন্য সময় কম। তাপদাহ বাড়ছে, চাহিদা বিস্ফোরিত হচ্ছে, এবং প্রতিযোগিতা কঠিন হচ্ছে। কিন্তু যদি ভারত সফলভাবে এই চ্যালেঞজ মোকাবেলা করতে পারে, তবে এটি শুধু একটি শিল্প নয়—এটি হবে একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক শক্তির উত্থান।

বিশ্ব রাজনীতিতে “শীতল যুদ্ধ” শব্দটি একসময় সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতীক ছিল।

আজ সেই শব্দের নতুন অর্থ তৈরি হচ্ছে। এবার যুদ্ধ হচ্ছে শীতলতা নিয়ে।

কে ভবিষ্যতের এসি প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করবে, কে কম্প্রেসার উৎপাদনে নেতৃত্ব দেবে এবং কে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ করবে—এসব প্রশ্নই আগামী দশকের অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

তাই এয়ার কন্ডিশনার এখন আর কেবল একটি গৃহস্থালি যন্ত্র নয়। এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার নতুন শক্তির প্রতীক।

 

তথ্যসূত্র: The Economist, Economic Times, Global Times, McKinsey Global Institute, India Today, Mint, Moneycontrol, PTI, ICRA, IMARC Group

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *