এমআই৬-এর আদলে নতুন গোয়েন্দা সংস্থা গড়ছে সুইডেন

সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমের স্টেনারগার্ড

দুই শতাব্দীরও বেশি সময় সামরিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার পর ২০২৪ সালে ন্যাটোতে যোগ দেয় সুইডেন। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এবার দেশটি তার গোয়েন্দা কাঠামোয় বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যক্রম শুরু করবে নতুন একটি বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা। এটি অনেকটাই ব্রিটেনের এমআই৬-এর আদলে পরিচালিত হবে।

সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমের স্টেনারগার্ড চলতি বছরের মে মাসে নতুন সংস্থা গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। নতুন সংস্থার নাম রাখা হয়েছে সুইডেন’স ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভস । সুইডিশ ভাষায় এর সংক্ষিপ্ত নাম UND। সংস্থাটি বিদেশে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং সরকারের জন্য কৌশলগত মূল্যায়ন তৈরির দায়িত্ব পালন করবে।

সুইডেন সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।

প্রথমত, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের আগে সুইডেনের বিদ্যমান গোয়েন্দা কাঠামো পরিস্থিতির যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেনি বলে দেশটির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। এতে বিদেশি গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।

দ্বিতীয়ত, ন্যাটোর সদস্য হওয়ার পর সুইডেনের ভূমিকা বদলে গেছে। এখন দেশটিকে শুধু নিজস্ব নিরাপত্তা নয়, জোটভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় এবং যৌথ গোয়েন্দা কার্যক্রমেও আরও সক্রিয় থাকতে হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টেনারগার্ড বলেছেন, ন্যাটোর সদস্য হিসেবে সুইডেন এখন নতুন ধরনের প্রত্যাশার মুখোমুখি।

তৃতীয়ত, বর্তমানে সুইডেনের সামরিক গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা MUST একই সঙ্গে রাশিয়া পর্যবেক্ষণ, ইউক্রেনকে সহায়তা এবং ন্যাটোর সঙ্গে সমন্বয়সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। নতুন সংস্থা চালু হলে এই চাপ কমবে।

বর্তমানে সুইডেনের গোয়েন্দা কাঠামো তিনটি প্রধান প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।

  • MUST বিদেশি সামরিক হুমকি, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা ও সামরিক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে।
  • SÄPO দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ এবং কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স পরিচালনা করে।
  • FRA সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স বা যোগাযোগভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে রয়েছে।

নতুন UND মূলত আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণের দায়িত্ব নেবে। এতে MUST সামরিক দায়িত্বে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, UND হবে একটি সম্পূর্ণ বেসামরিক সংস্থা। এটি সরাসরি সরকারের অধীনে পরিচালিত হবে। সংস্থার প্রধান দায়িত্ব হবে সুইডেনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বিদেশি হুমকি শনাক্ত করা এবং সময়োপযোগী গোয়েন্দা মূল্যায়ন তৈরি করা।

এজন্য নতুন আইনি কাঠামোও প্রণয়ন করা হচ্ছে। সেখানে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং গোপন পরিচয়ে কাজ করার বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

নতুন সংস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার, অর্থাৎ প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সুইডেনের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি দেশের প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়। এটি ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশের পরিবর্তনের প্রতিফলন।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, হাইব্রিড যুদ্ধের বিস্তার, সাইবার হামলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণ এবং চীনের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রভাব ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের গোয়েন্দা সক্ষমতা নতুনভাবে মূল্যায়নে বাধ্য করেছে।

ফলে অনেক দেশই এখন বিদেশি গোয়েন্দা সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।

নতুন সংস্থার সামনে শুরু থেকেই বেশ কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে।

মধ্যপ্রাচ্য, চীন এবং আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পূর্বাভাস তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে ওপেন-সোর্স ইন্টেলিজেন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ন্যাটোর গোয়েন্দা মানদণ্ডের সঙ্গে পূর্ণ সামঞ্জস্য অর্জনও হবে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমের স্টেনারগার্ডের ভাষায়, ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে তথ্যগত সুবিধা, দ্রুত বিশ্লেষণ এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৭ সালে UND-এর কার্যক্রম শুরু হলে এটি হবে সুইডেনের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গোয়েন্দা সংস্কারের একটি। একই সঙ্গে এটি ইউরোপের পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতায় সুইডেনের নতুন কৌশলগত অবস্থানেরও প্রতিফলন।

 

সূত্র: ইউরোনিউজ, নর্ডিক ডিফেন্স সেক্টর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *