ইতালীয় ফুটবল হারাল তার অন্যতম সেরা রক্ষণশিল্পীকে। এসি মিলান ও ইতালি জাতীয় দলের কিংবদন্তি অধিনায়ক ফ্র্যাঙ্কো বারেসি ৬৬ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে বিশ্ব ফুটবলে।
ফুটবলের ইতিহাসে অনেক মহান ডিফেন্ডার এসেছেন, কিন্তু বারেসির মতো নেতৃত্ব, বুদ্ধিমত্তা ও আনুগত্যের সমন্বয় খুব কম খেলোয়াড়ের মধ্যেই দেখা গেছে। তিনি শুধু একজন সেন্টার-ব্যাক ছিলেন না; তিনি ছিলেন মাঠের ভেতরের একজন সংগঠক, যিনি পুরো রক্ষণভাগকে পরিচালনা করতেন একজন অর্কেস্ট্রা পরিচালকের মতো।
১৯৭৭ সালে এসি মিলানের হয়ে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন বারেসি। এরপর দুই দশক ধরে একই ক্লাবের জার্সিতে খেলেছেন তিনি। ১৯৯৭ সালে অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত মিলানের হয়েই কাটিয়েছেন পুরো ক্যারিয়ার। ৭০০-এর বেশি ম্যাচে মাঠে নামা এই ডিফেন্ডার ১৫ বছর ক্লাবটির অধিনায়ক ছিলেন।
তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুটাও ছিল এক ধরনের নাটকীয় গল্প। বারেসি পরিবারের বড় ভাই জুসেপ্পে বারেসি ইন্টার মিলানে সুযোগ পেলেও ছোট ভাই ফ্র্যাঙ্কো প্রথমে নেরাজ্জুরিদের পছন্দের তালিকায় ছিলেন না। ইন্টার মিলানের যুবদলে সুযোগ না পেয়ে শহরেরই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এসি মিলানে যোগ দিয়েছিলেন বারেসি। ১৯৭৭ সালে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করে অবসর নেওয়া পর্যন্ত পুরো ক্যারিয়ার কাটিয়েছেন লাল-কালো জার্সিতেই। দুই দফা রেলিগেশনের সময়ও তিনি ক্লাবের পাশে ছিলেন এবং দুবারই মিলানকে আবার শীর্ষ লিগে ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বারেসির আনুগত্যের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এসেছিল কঠিন সময়ে। ১৯৮০ সালের ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারির পর এসি মিলানকে সেরি বি-তে নামিয়ে দেওয়া হয়। আবার ১৯৮২ সালেও ক্লাবকে অবনমনের শিকার হতে হয়। সেই সময় অনেকেই ক্লাব ছাড়লেও বারেসি থেকে যান।
১৯৮৬ সালে সিলভিও বার্লুসকোনি এসি মিলানের মালিকানা গ্রহণের পর কোচ আরিগো সাক্কির অধীনে গড়ে ওঠে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা দল। রুড গুলিট, মার্কো ফন বাস্তেন ও ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডের মতো ডাচ তারকারা যোগ দেন। রক্ষণভাগে ছিলেন মাউরো তাসোত্তি, পাওলো মালদিনি, আলেসান্দ্রো কোস্তাকুর্তা এবং অধিনায়ক ফ্র্যাঙ্কো বারেসি।
সাক্কির জোনাল মার্কিং, উচ্চ প্রেসিং ও দ্রুত পাসিংভিত্তিক ফুটবলের মূল ভিত্তি ছিল এই রক্ষণভাগ। মাঠে পুরো দলকে সংগঠিত রাখার দায়িত্ব পালন করতেন বারেসি। তাঁর নেতৃত্বে এসি মিলান ১৯৮৮-৮৯ থেকে ১৯৯৩-৯৪ সময়ে ইউরোপীয় ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করে এবং একাধিক সেরি আ ও ইউরোপিয়ান কাপ/চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জেতে।
ইতালি জাতীয় দলেও বারেসির নেতৃত্ব ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯০ বিশ্বকাপে স্বাগতিক ইতালি সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে গেলেও চার বছর পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে আবার ফাইনালে ওঠে আজ্জুরিরা।
১৯৯৪ বিশ্বকাপের প্রথম পর্বে নরওয়ের বিপক্ষে হাঁটুর চোটে পড়ে বারেসির টুর্নামেন্ট শেষ বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু কোচ আরিগো সাক্কি তাঁর অধিনায়কের ওপর আস্থা রাখেন। ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে বারেসি দলে ফিরে দুর্দান্ত রক্ষণ সামলান। রোমারিওকে পুরো ম্যাচে কার্যত নিষ্ক্রিয় রাখেন তিনি। যদিও টাইব্রেকারে নিজের শট মিস করেন এবং ইতালি শিরোপা জিততে পারেনি।
ফুটবলবিশ্বে পাওলো মালদিনির নান্দনিকতা যেমন কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে, তেমনি নির্ভরযোগ্যতা, নেতৃত্ব, ট্যাকটিক্যাল বুদ্ধিমত্তা ও রক্ষণ সংগঠনের দক্ষতার জন্য ফ্র্যাঙ্কো বারেসিকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শারীরিক উচ্চতায় তিনি খুব বড় নন, কিন্তু তাঁর পড়ার ক্ষমতা, পজিশনিং, নেতৃত্ব এবং মাঠের পরিস্থিতি বোঝার দক্ষতা তাঁকে বিশ্বসেরাদের কাতারে নিয়ে যায়।
এসি মিলান তাঁর সম্মানে অবসর দিয়েছে তাদের ৬ নম্বর জার্সি। ক্লাবের ইতিহাসে তিনি শুধু একজন খেলোয়াড় নন, বরং আনুগত্য ও নেতৃত্বের প্রতীক।
ফ্র্যাঙ্কো বারেসির বিদায়ে ফুটবল হারাল এক যুগের শেষ মহান রক্ষণনেতাকে। তাঁর মতো খেলোয়াড়রা শুধু ট্রফি জেতেন না, তাঁরা একটি প্রজন্মকে শেখান—ফুটবল শুধু গোল করার খেলা নয়, কখনো কখনো একটি দলকে বাঁচিয়ে রাখার শিল্পও।