উত্তর কোরিয়াকে সাধারণত বিশ্বের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি দুর্ভিক্ষ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক সংকটের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির অভ্যন্তরে এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, যা অনেক বিশ্লেষককে বিস্মিত করেছে।
মার্কিন সংবাদপত্র দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সম্প্রতি উত্তর কোরিয়াকে বিশ্বের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্পগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই সাফল্যের পেছনে সরকারি কোনো সংস্কার কর্মসূচি নয়, বরং সাধারণ মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম এবং বাজারভিত্তিক উদ্যোগ বড় ভূমিকা রেখেছে।
৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে উত্তর কোরিয়া ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখে পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দেশটির অর্থনীতি বড় ধাক্কা খায়। একই সময়ে বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ খাদ্য উৎপাদন কমিয়ে দেয়। সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে।
খাদ্যের সংকটে পড়ে মানুষ নিজেরাই বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে। তারা খাদ্য, পোশাক, গৃহস্থালি সামগ্রী এবং বিভিন্ন পণ্য কেনাবেচা শুরু করে। এভাবেই গড়ে ওঠে জাংমাদাং নামে পরিচিত স্থানীয় বাজারগুলো।
শুরুতে এসব বাজার অবৈধ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো সাধারণ মানুষের জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিস -এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৮ সাল নাগাদ উত্তর কোরিয়ায় অন্তত ৪৩৬টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত বাজার ছিল। এসব বাজার দেশের প্রায় সব প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
বাজারগুলো শুধু পণ্য কেনাবেচার স্থান নয়। এগুলো কর্মসংস্থান, আয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছে। গবেষকদের মতে, বাজার থেকে কর এবং ভাড়া বাবদ সরকার প্রতিবছর কয়েক কোটি ডলার রাজস্ব পায়।
বাজার সম্প্রসারণের ফলে উত্তর কোরিয়ায় নতুন এক ব্যবসায়ী শ্রেণীর জন্ম হয়েছে। তাদের বলা হয় ‘দনজু’ বা অর্থশালী উদ্যোক্তা।
এই ব্যবসায়ীরা ব্যক্তিগত পুঁজি বিনিয়োগ করে ব্যবসা পরিচালনা করেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে কাজ করেন। কৃষি, নির্মাণ, মৎস্য, খনিজ সম্পদ এবং পরিবহন খাতে তাদের বিনিয়োগ বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিতে এখন দনজুরা গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়নকারী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় সীমিত। তবুও মোবাইল ফোনের বিস্তার বাজার অর্থনীতিকে নতুন গতি দিয়েছে।
ব্যবসায়ীরা এখন দ্রুত পণ্যের দাম, সরবরাহ এবং চাহিদা সম্পর্কে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারেন। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারের মধ্যে সমন্বয় বেড়েছে।
একই সঙ্গে বেসরকারি পরিবহন নেটওয়ার্কও গড়ে উঠেছে। সরকারি ব্যবস্থার ঘাটতি পূরণ করে এসব নেটওয়ার্ক বাজারে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করছে।
উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো চীনের সঙ্গে বাণিজ্য।
চীন দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। সীমান্তবর্তী এলাকায় আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক উভয় ধরনের বাণিজ্য চলে। চীন থেকে ভোক্তা পণ্য, যন্ত্রপাতি এবং শিল্পপণ্য আসে। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া খনিজ সম্পদসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বাণিজ্য দেশটির বাজার অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের ওপর পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস এখন বাজারভিত্তিক কর্মকাণ্ড।
অনেক নাগরিক মনে করেন, সরকারি বিতরণ ব্যবস্থা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে না। ফলে খাদ্য, পোশাক এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য তারা বাজারের ওপর নির্ভরশীল।
বাজারের মাধ্যমে বিদেশি পণ্য এবং বাইরের বিশ্বের তথ্যও দেশটিতে প্রবেশ করছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আসছে।
উত্তর কোরিয়ার সরকার বাজারকে পুরোপুরি সমর্থনও করে না, আবার সম্পূর্ণ বন্ধও করতে পারে না।
একদিকে বাজার অর্থনীতি জনগণের জীবনধারণ সহজ করেছে এবং সরকারকে রাজস্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে এটি রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
অতীতে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও সেগুলো দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়নি। কারণ সাধারণ মানুষের জীবিকা এখন অনেকাংশে এই বাজারের ওপর নির্ভরশীল।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, উত্তর কোরিয়ায় ধীরে ধীরে একটি হাইব্রিড অর্থনীতি গড়ে উঠছে। রাজনৈতিকভাবে দেশটি সমাজতান্ত্রিক কাঠামো বজায় রাখলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাজারের ভূমিকা বাড়ছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য সম্পত্তির অধিকার, বিনিয়োগের নিরাপত্তা এবং আইনি কাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়া এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা মূলত সাধারণ মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা এবং টিকে থাকার সংগ্রামের ফল। দুর্ভিক্ষের সময় জন্ম নেওয়া ছোট ছোট বাজার আজ দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সাফল্য বলা যাবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কারণ দেশটি এখনও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, সীমিত বিনিয়োগ এবং কাঠামোগত দুর্বলতার মুখোমুখি।
তারপরও একটি বিষয় স্পষ্ট—উত্তর কোরিয়ার বাজারভিত্তিক এই রূপান্তর বিশ্বের সবচেয়ে নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রগুলোর একটির ভেতরে নীরবে চলমান এক বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।