পারস্য উপসাগরে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছে, কিন্তু শান্তি ফিরে আসেনি। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কার্যকর হওয়া এই যুদ্ধবিরতিকে অনেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন। বোস্টন রিভিউ-তে প্রকাশিত আসলি উ. বালির বিশ্লেষণী নিবন্ধে বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতি কেবল একটা বিরতি নয়, এটি একটি নতুন, অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠনের পূর্বাভাস।
২০২৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল “অপারেশন এপিক ফিউরি” নামে ব্যাপক সামরিক হামলা চালায় ইরানের ওপর। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই নিহত হন। এটি শুধুমাত্র সামরিক আক্রমণ নয় — এটি ছিল একটি শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রে আঘাত, একটি নতুন ধরনের “রেজিম চেঞ্জ” কৌশলের প্রয়োগ।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের কাছে “অস্তিত্বগত হুমকি” ছিল। ২০২৫ সালে ইরান আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার তদন্তাধিকার সীমিত করে দেশীয় আইনে রূপ দেয়। এরপর জেনেভায় পারমাণবিক আলোচনা ভেস্তে যায়। ট্রাম্প প্রশাসন “শক্তির মাধ্যমে শান্তি” কৌশলকে আবার প্রাধান্য দেয়। ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান ছিল এরই প্রতীকী উদাহরণ।
যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তখনই আসে, যখন ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল রপ্তানি হয়। জাপানের মতো দেশগুলোর জন্য এটি ছিল সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি — জাপান তার অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ এ পথ দিয়ে আমদানি করে।
আসলি বালি তার নিবন্ধে লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট শক্তিশালী কিন্তু যা ভেঙেছে তার পরিণতি স্থিতিশীল করতে অক্ষম”। হরমুজ প্রণালী এখন “অবরোধ ও বাণিজ্যিক পথ” — দুটোর মাঝে ঝুলছে। ইরান এটাকে “বার্গেনিং চিপ” হিসেবে ব্যবহার করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র এটাকে “ডি-এসক্যালেশনের মাপকাঠি” হিসেবে দেখছে। কিন্তু বাস্তবে দুই পক্ষই একে অপরের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে ছিল — হামলার গ্যারান্টি, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, ইসরায়েলি হামলা বন্ধ, সব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, এবং হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়া। কিন্তু এর বিনিময়ে প্রতি জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ডলার “ট্রানজিট ফি” চাইছিল ইরান। আয় ওমানের সাথে ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাবও ছিল।
যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্য। নেতানিয়াহুর “ঘাস কাটা” কৌশল — অর্থাৎ নিয়মিত বিধ্বংসী হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা — ট্রাম্পের কূটনৈতিক কৌশলকে জটিল করে তুলেছে।
লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় হাজার হাজার মানুষ নিহত, লাখো মানুষ বাস্তুহারা। চিকিৎসা সুবিধা ও পুরো গ্রাম ধ্বংসের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সমালোচনা তুঙ্গে। ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুকে “পাগল” বলতে শোনা গেছে — কারণ ইসরায়েলের এসক্যালেশন মার্কিন-সমর্থিত আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
আসলি বালি মন্তব্য করেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থের বিচ্যুতি আর কোনো প্রান্তিক প্রশ্ন নয়”। ইসরায়েলের কৌশলের খরচ প্রথমে বহন করে লেবানন ও ফিলিস্তিনের বেসামরিক নাগরিকরা, কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্রও এর মূল্য দেয় — বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, নৌবাহিনীর বিপুল মোতায়েন, অস্ত্রাগার শূন্য হওয়া, এবং আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ। যুদ্ধের ব্যয় প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
যুদ্ধের আরেক ভিক্টিম — উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান পরে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর কাছে ক্ষমা চান, বলেন “এটি মিসকমিউনিকেশনের কারণে”। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণকারী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেন এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মার্কিন সামরিক উপস্থিতির “ঝুঁকি” তুলে ধরেন।
এখন প্রশ্ন হলো — ভবিষ্যতে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো কি মার্কিন সামরিক ঘাঁটির আতিথ্য দিতে চাইবে? যদি মার্কিন উপস্থিতি নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বিশ্বজুড়ে মার্কিন মিত্রদের মধ্যেও দেখা যাবে। জাপান ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো এবং বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার নতুন ধারা তৈরি করতে পারে।
আসলি বালি তার নিবন্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরেছেন — “যুদ্ধটি সামরিক ও অর্থনৈতিক মুখোমুখির মধ্যে এত দ্রুত দোলায়মান হয়েছে যে দুই বিভাগের মধ্যে পার্থক্য মুছে গেছে”। দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক বিচ্ছিন্নতাকে “যুদ্ধের চেয়ে কম” হিসেবে চিত্রিত করেছে। কিন্তু কিউবা, ইরান, ভেনেজুয়েলা, ইরাকের মতো দেশগুলোর কাছে এটি ছিল সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আক্রমণ।
যখন যুক্তরাষ্ট্র তার আর্থিক শক্তি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে, তখন একে “জাতীয় নিরাপত্তা” বলা হয়। কিন্তু যখন ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে, তখন একে “এসক্যালেশন” বলা হয়। এই দ্বৈত মানদণ্ড এখন বিশ্বের কাছে স্পষ্ট।
যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে যে “নতুন বিশ্ব” আবির্ভূত হচ্ছে, তার কিছু বৈশিষ্ট্য:
শক্তির নতুন ভারসাম্য: যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ, কিন্তু তার ক্ষমতা “ভাঙার” জন্য — “গড়ার” জন্য নয়। ইরান দেখিয়েছে, কনভেনশনাল শক্তিতে পিছিয়ে থাকা একটি দেশও বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
মিত্রতার পুনর্মূল্যায়ন: উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এখন “সম্পূর্ণ মিত্র” ও “নিরপেক্ষ” — দুটোর মাঝে ঝুলছে। ভবিষ্যতে তারা হয়তো একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সাথে সম্পর্ক গড়বে।
অর্থনৈতিক অস্ত্রায়ন: হরমুজ প্রণালী, চিপ সাপ্লাই চেইন, আর্থিক নেটওয়ার্ক — এসব এখন সামরিক কৌশলের অংশ। “অর্থনৈতিক যুদ্ধ” ও “সামরিক যুদ্ধ” আর আলাদা নয়।
বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতা: রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য (স্যাটেলাইট ইমেজ, ইলেকট্রনিক সিগন্যাল) সরবরাহ করতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া-ইরান সামরিক সহযোগিতা আরও দৃঢ় হয়েছে। চীনও এই অঞ্চলে তার প্রভাব বাড়াতে পারে।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা ছিল, পরে তা বাড়ানো হয়। কিন্তু মে মাসেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গোলাগুলির খবর আসে। এটি দেখায়, “যুদ্ধবিরতি” কেবল একটা কাগজের কথা — মাঠের অবস্থা ভিন্ন।
আসলি বালি শেষে লিখেছেন, “আজকের ভূদৃশ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যে নিজেকে বিশ্বব্যবস্থার গ্যারান্টর বলে দাবি করে, সেই শক্তিই এখন তার বিচ্ছিন্নতার প্রধান ত্বরক”। পারস্য উপসাগরের যুদ্ধবিরতি কেবল একটা বিরতি নয় — এটি একটি নতুন, অস্থির, বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার জন্মলগ্ন।
—
আসলি উ. বালি — ইয়েল ল স্কুলের অধ্যাপক, মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ। তার নিবন্ধটি বোস্টন রিভিউ-তে প্রকাশিত হয়েছে।