ইউএসএস লিবার্টিতে হামলা: ছয় দশক পর নতুন করে তদন্তের দাবি জোরালো

১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন গোয়েন্দা জাহাজ ইউএসএস লিবার্টির ওপর ভয়াবহ হামলার ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে কংগ্রেসে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি উঠেছে। ঘটনার প্রায় ৬০ বছর পরও বিষয়টি ঘিরে বিতর্ক ও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

১৯৬৭ সালের ৮ই জুন, সিনাই উপদ্বীপের কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মিশন চালাচ্ছিল জাহাজটি। সে সময় ইসরায়েলি বিমান ও টর্পেডো নৌকার আক্রমণে জাহাজটি গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হামলায় ৩৪ জন মার্কিন নৌসেনা নিহত হন এবং ১৭০ জনের বেশি আহত হন। জাহাজে হামলায় রকেট, কামানের গোলা এবং টর্পেডো ব্যবহার করা হয়। একটি টর্পেডোর আঘাতে জাহাজের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে নৌবাহিনীর নথিতে উল্লেখ আছে।

ঘটনার পর ইসরায়েল এটিকে ভুল পরিচয়ের ফল বলে দাবি করে এবং দুঃখ প্রকাশ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখনকার প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন ব্যক্তিগতভাবে ক্ষুব্ধ হলেও প্রকাশ্যে ইসরায়েলের ব্যাখ্যা গ্রহণ করে নেন।

তবে, ইউএসএস লিবার্টির বেঁচে যাওয়া সদস্যরা সর্বদাই এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, জাহাজটির উপর স্পষ্টভাবে মার্কিন পতাকা উড়ছিল, আকাশ পরিষ্কার ছিল, এবং ইসরায়েলি পাইলটরা জাহাজের জিটিআর-৫ চিহ্ন দেখতে পেয়েছিল। আল জাজিরার তদন্ত প্রতিবেদন “দ্য ডে ইসরায়েল এটাকড আমেরিকা “-তে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলি পাইলট এবং গ্রাউন্ড কন্ট্রোলের মধ্যে হিব্রু ভাষায় হওয়া অডিও বিনিময় প্রকাশ করা হয়, যেখানে কমপক্ষে তিনবার জাহাজটিকে মার্কিন বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয় মার্কিন নৌবাহিনীর মাধ্যমে। পাশাপাশি কিছু ভেটেরান সংগঠন, যেমন ভেটেরান ফর ফরেন ওয়ার্স এবং আমেরিকান লিজিয়ন, কংগ্রেসে পুনঃতদন্তের আহ্বান জানায়।

২০০৩ সালের দিকে কিছু সাবেক সামরিক ও আইনি ব্যক্তির বক্তব্য এবং ভেটেরানদের কমিশন রিপোর্টের ভিত্তিতে আবারও প্রশ্ন ওঠে।  একাধিক পক্ষের মতে, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্ত হলেও তা পূর্ণাঙ্গ ছিল কি না—এ নিয়ে বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি। কিছু সমালোচক দাবি করেন, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিবেচনায় বিষয়টি গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি।

সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসম্যান টমাস ম্যাসি নতুন করে এই হামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। এ উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে ইউএসএস লিবার্টির জীবিত সদস্যরা দীর্ঘদিনের বিচার দাবিকে আবার সামনে এনেছেন।

তবে ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ঘটনাটি নিয়ে আগের তদন্ত ও নথিপত্র বিদ্যমান থাকলেও ব্যাখ্যার জায়গায় ভিন্নতা রয়ে গেছে।

প্রায় ছয় দশক পরও প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে—একটি মিত্র দেশের হাতে মার্কিন নৌসেনাদের মৃত্যু ঘিরে প্রকৃত সত্য কতটা পরিষ্কারভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত।

ইউএসএস লিবার্টির ঘটনা মার্কিন-ইসরায়েলি সম্পর্কের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে, যেখানে ন্যায়বিচার এবং স্বচ্ছতার দাবি বারবার উপেক্ষিত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *