সীমান্তে ‘নীরব প্রতিরোধ’: পুশ-ইন ঠেকাতে বিজিবির পাশে সাধারণ মানুষ

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে গত কয়েক দিনে একের পর এক পুশ-ইনের চেষ্টা ঘিরে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) এসব প্রচেষ্টা প্রতিহত করছে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষও নজিরবিহীনভাবে এই কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে। ফলে সীমান্তে গড়ে উঠেছে এক ধরনের যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গত সপ্তাহে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় একাধিকবার ভারতীয়দেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিজিবি তা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে।

ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে এমন একটি ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কয়েক ডজন মানুষকে প্রিজন ভ্যানে করে সীমান্ত এলাকায় নিয়ে আসে। পরে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। খবর পেয়ে বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। স্থানীয় বাসিন্দারাও সেখানে জড়ো হন। তাদের উপস্থিতি ও প্রতিরোধের মুখে ওই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় বলে জানা গেছে।

লালমনিরহাটের আদিতমারী, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম সীমান্তেও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রাতের অন্ধকারে কয়েক দফা পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। বিজিবি সীমান্তে টহল জোরদার করে এবং এলাকাবাসীর সহায়তায় এসব প্রচেষ্টা প্রতিহত করে।

পঞ্চগড় সীমান্তে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। সেখানে নারী ও শিশুসহ কয়েকজনকে শূন্যরেখায় রেখে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে তারা দীর্ঘ সময় সীমান্তের জিরো লাইনে অবস্থান করেন। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ হয়। পরবর্তীতে তাদেরকেও ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে বিএসএফ।।

সীমান্ত এলাকায় বর্তমানে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তা হলো সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। বিভিন্ন এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবীরা বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন। অনেক স্থানে গ্রামবাসীরা রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও যৌথ টহলও পরিচালিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সীমান্তে সন্দেহজনক চলাচল বা নতুন কোনো তৎপরতার তথ্য দ্রুত বিজিবিকে জানানো হচ্ছে। এতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হচ্ছে।

নেত্রকোণাসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রাতের টহলে মেগাফোন, সার্চলাইট ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। বিজিবি সীমান্তজুড়ে নজরদারি বাড়িয়েছে। বিভিন্ন জেলার সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত সদস্যও মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো, এসব ক্ষেত্রে অবৈধভাবে অবস্থানকারী ব্যক্তিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তবে বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে স্বীকৃত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন। পরিচয় যাচাই ও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ছাড়া কাউকে সীমান্তে এনে ছেড়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বর্তমান পরিস্থিতি শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার সঙ্গেও জড়িত। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সীমান্তে চলমান এই পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সীমান্ত এলাকায় এখন শুধু বিজিবিই নয়, সাধারণ মানুষও সীমান্ত নিরাপত্তার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *