ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ড সফর শেষে দেশে ফিরেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গত শুক্রবার দেশে ফিরে তিনি রোববার (৭ই জুন) রাজধানীর মিরপুরে নিজ কার্যালয়ে যোগ দেন। সফরকালে তিনি সামাজিক ব্যবসা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, নারীর ক্ষমতায়ন, যুব উন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
গত ২৭শে মে ঢাকা থেকে প্যারিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন প্রফেসর ইউনূস। পরে ৩১শে মে তিনি নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে পৌঁছান। প্রায় এক সপ্তাহের এই সফরে ইউরোপের বিভিন্ন নীতিনির্ধারক, ব্যাংকার, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সংস্থার নেতাদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়।
প্যারিসে পৌঁছে তিনি ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল গ্রুপের চেয়ারম্যান এরিক ভিয়ালের উপস্থিতিতে আয়োজিত এক নৈশভোজে অংশ নেন। পাশাপাশি তিনি গ্রামীণ ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল ফাউন্ডেশনের ৫০তম বোর্ড সভায় যোগ দেন।
২০০৮ সালে ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল এস.এ. এবং প্রফেসর ইউনূসের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল ফাউন্ডেশন বর্তমানে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত প্রায় ৪০টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশে ৮২ মিলিয়ন ইউরোর বেশি বিনিয়োগ করেছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের ৭০ লাখেরও বেশি প্রান্তিক মানুষ উপকৃত হয়েছে। ফাউন্ডেশনটির কার্যক্রমের বড় অংশ গ্রামীণ উন্নয়ন ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে।
প্যারিসে অনুষ্ঠিত আরেকটি উচ্চপর্যায়ের সংলাপে অংশ নেন প্রফেসর ইউনূস। এতে নারী-পুরুষ সমতা ও বৈষম্যবিরোধী কার্যক্রমবিষয়ক ফরাসি মন্ত্রী অরোরে বের্জে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি খাতের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় গ্রামীণ ব্যাংকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রফেসর ইউনূস বলেন, আর্থিক ক্ষমতায়ন ও স্বনির্ভরতা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তিনি বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, তরুণদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ দেখিয়েছে যে নতুন প্রজন্ম সামাজিক পরিবর্তনের বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। তিনি বিশেষভাবে তরুণীদের ভূমিকার প্রশংসা করেন।
প্যারিস সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নবনির্বাচিত প্যারিসের মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোয়ারের সঙ্গে বৈঠক। সেখানে সামাজিক ব্যবসার বিস্তার এবং তরুণদের নেতৃত্বে ‘থ্রি জিরো ক্লাব’ গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়। ‘তিন শূন্যের বিশ্ব’ ধারণার মধ্যে রয়েছে শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নেট কার্বন নিঃসরণ।
বৈঠকে প্যারিসে ‘সামাজিক ব্যবসা দিবস’ চালুর প্রস্তাবও আলোচনায় আসে। ভবিষ্যতে এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও নিয়ে আলোচনা হয়। এ উদ্যোগ এগিয়ে নিতে প্যারিস সিটির প্রতিনিধিদের ঢাকায় অনুষ্ঠেয় সোশ্যাল বিজনেস ডেতে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
আমস্টারডামে প্রফেসর ইউনূস ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন শহরের স্থানীয় সরকার ও এনজিও নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে নেপলস, পোটেঞ্জা এবং পালের্মো শহরে সামাজিক ব্যবসা মডেল বাস্তবায়নের নতুন উদ্যোগ শুরু হয়।
এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো পিছিয়ে থাকা নগর এলাকাগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
সফরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল নেদারল্যান্ডসের বৃহত্তম দাতব্য প্রতিষ্ঠান ডাচ পোস্টকোড লটারির আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রফেসর ইউনূসের মূল বক্তব্য প্রদান। ৮৫০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারীর উপস্থিতিতে তিনি ‘তিন শূন্যের বিশ্ব’ ধারণা তুলে ধরেন।
বক্তব্যে তিনি বলেন, মানুষ শুধু পৃথিবীর যাত্রী নয়, বরং ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চালিকাশক্তিও। তাই দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্বে আসতে হবে।
আমস্টারডামে ডাচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হয়। সেখানে বাংলাদেশে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
এছাড়া ডাচ পার্লামেন্টে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে সামাজিক ব্যবসা, মাইক্রোক্রেডিট এবং উন্নয়ন সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন প্রফেসর ইউনূস। আলোচনায় দারিদ্র্য দূরীকরণে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে প্রফেসর ইউনূস ইউরোপে সামাজিক ব্যবসা আন্দোলনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করার পাশাপাশি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও শক্তভাবে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে ‘তিন শূন্যের বিশ্ব’ ধারণাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের নতুন সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে।
সফরে প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে ছিলেন গ্রামীণ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল হাসান, ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোরশেদ এবং ওয়াই ওয়াই ভেঞ্চার্সের প্রতিষ্ঠাতা সজীব এম খায়রুল ইসলাম।