মালদ্বীপের বিপক্ষে ড্র করে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশের অলিম্পিক ফুটবল দল। তবে ফলাফলের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে দলের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা, কোচিং সিদ্ধান্ত এবং ম্যাচ পরিচালনায় রেফারির বিতর্কিত ভূমিকা।
ম্যাচজুড়ে বাংলাদেশের তরুণ ফুটবলারদের প্রচেষ্টা ও নিবেদন ছিল চোখে পড়ার মতো। মালদ্বীপের মূল জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বিপক্ষে তারা লড়াই করেছে সাহসিকতার সঙ্গে। পাসিং, ড্রিবলিং এবং বল নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন ফুটবলার আধুনিক ফুটবলের ছাপ দেখিয়েছেন। বিশেষ করে রাহুল জুনিয়রের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য বারবার প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ তৈরি করেছে।
তবে দলগত আক্রমণে ছিল স্পষ্ট দুর্বলতা। পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ একটি সুসংগঠিত আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেনি। ওপেন প্লে থেকে গোলের দেখা না পাওয়া দলের আক্রমণভাগের সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
ম্যাচে বাংলাদেশের কৌশল ছিল মূলত উইং-নির্ভর। মাঝমাঠ থেকে বল উইংয়ে পাঠিয়ে ক্রসের মাধ্যমে সুযোগ তৈরির চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মালদ্বীপের কোচ আলী সুজেইন শুরু থেকেই এই পরিকল্পনা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামেন। তারা নিচু রক্ষণভাগ বা লো-ব্লক কৌশল গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় অঞ্চল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে রাখে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উইঙ্গারদের ওপর ডাবল মার্কিং প্রয়োগ করে ক্রসগুলো সহজেই প্রতিহত করে।
বাংলাদেশের কৌশলের বড় দুর্বলতা ছিল বক্সে কার্যকর স্ট্রাইকারের অনুপস্থিতি। পর্যাপ্ত টার্গেটম্যান ছাড়াই একের পর এক ক্রস তোলা হয়, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফলহীন থেকে যায়।
কোচের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ম্যাচের শেষ দিকে একসঙ্গে দুইজন নাম্বার নাইন নামানো হলেও তাদের কাছে বল পৌঁছানোর মতো সৃজনশীল খেলোয়াড় মাঠে রাখা হয়নি। বরং উইং থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার সক্ষমতা কমে যাওয়ায় আক্রমণের ধার আরও ভোঁতা হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে মালদ্বীপ ধারাবাহিকভাবে রক্ষণ মজবুত করতে পরিবর্ত খেলোয়াড় নামায় এবং নিজেদের লিড ধরে রাখার পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করে। বাংলাদেশের আক্রমণাত্মক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে তারা দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক চালায়।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন ২২ নম্বর জার্সিধারী প্রণয়। স্বাভাবিকভাবে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে খেলা এই ফুটবলারকে উইং-ব্যাক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আক্রমণে অংশ নিতে গিয়ে তিনি কয়েকবার নিজের পজিশন ছেড়ে ওপরে উঠে যান। সেই ফাঁকা জায়গা কাজে লাগিয়ে মালদ্বীপ দ্রুত আক্রমণ গড়ে তোলে এবং এক পর্যায়ে পেনাল্টি আদায় করে গোল করতে সক্ষম হয়।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, মালদ্বীপের ঘন রক্ষণভাগ ভাঙতে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল মাঝমাঠে দ্রুত ছোট ছোট পাসের সমন্বয়, ত্রিভুজাকৃতির পজিশনিং এবং দ্রুত সাইড পরিবর্তনের কৌশল। কিন্তু মাঝমাঠের ধীরগতির পাসিংয়ের কারণে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ভাঙা সম্ভব হয়নি।
ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পর মিরাজুলের পেনাল্টি থেকে করা গোল বাংলাদেশের সমর্থকদের নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই প্রত্যাবর্তন পূর্ণতা পায়নি।
ম্যাচ শেষে রেফারিং নিয়েও সমালোচনা শুরু হয়। বাংলাদেশের পক্ষে একটি স্পষ্ট থ্রো-ইন সিদ্ধান্ত না দেওয়া, সম্ভাব্য হ্যান্ডবলের ঘটনায় পেনাল্টি না পাওয়া এবং একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে গিয়ে দলীয় ম্যানেজার শাহিন লাল কার্ড দেখেন, যা অনেকের মতে ছিল অপেশাদার আচরণ।
সব মিলিয়ে তরুণ ফুটবলারদের পারফরম্যান্স আশাব্যঞ্জক হলেও ট্যাকটিক্যাল দুর্বলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমাবদ্ধতা এবং বিতর্কিত রেফারিংয়ের কারণে বাংলাদেশের অলিম্পিক দলের যাত্রা শেষ হয়েছে হতাশার মধ্য দিয়ে।