বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসের অংশ ছিলেন, তেমনি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের বহু বিতর্কিত অধ্যায়ের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে আছে।
রাজনীতিবিদ হিসেবে তোফায়েল আহমেদের মূল্যায়ন সবসময়ই দুই বিপরীত ধারায় হয়েছে। একদিকে তিনি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। অন্যদিকে সমালোচকদের একটি অংশ তাঁকে স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদ, দলীয়করণ এবং জাতীয় রক্ষীবাহিনীর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করে।
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক উত্থান ঘটে ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ডাকসুর সহ-সভাপতি এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা হিসেবে তিনি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ২৩শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণার সঙ্গে তাঁর নাম স্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়। আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধপন্থী রাজনৈতিক ধারায় এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হলেও, কিছু গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, গণঅভ্যুত্থানের বহুমাত্রিক চরিত্রকে পরবর্তীতে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতির দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াও তখন শুরু হয়েছিল।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তোফায়েল আহমেদ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ক্ষমতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।
এ সময় প্রশাসনে দলীয় প্রভাব বৃদ্ধির অভিযোগ ওঠে। অনেক গবেষক ও সাবেক আমলা মনে করেন, স্বাধীনতার পর প্রশাসনিক কাঠামোয় রাজনৈতিক আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়, তার সূচনালগ্নে তোফায়েল আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সমর্থকরা অবশ্য এটিকে নতুন রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় জাতীয় রক্ষীবাহিনীকে ঘিরে।
১৯৭২ সালে গঠিত এই বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক কর্মী দাবি করেছেন যে, জাসদ এবং বামপন্থী কর্মীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে রক্ষীবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
তবে এসব অভিযোগের অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারিক তদন্ত হয়নি। ফলে নিহতের সংখ্যা, ঘটনার ব্যাপ্তি এবং দায় নির্ধারণ নিয়ে এখনো ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, রক্ষীবাহিনীর কর্মকাণ্ড স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা দাবি করেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজন থেকেই বাহিনীটি গঠন করা হয়েছিল।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মতো তোফায়েল আহমেদও দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক চাপে ছিলেন। পরে তিনি আবার জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বক্তা ও সংগঠক হিসেবে পরিচিতি পান।
তবে আওয়ামী লীগের ভেতরেও তাঁর অবস্থান সবসময় নির্বিঘ্ন ছিল না। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতার ভারসাম্য, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ফলে ধীরে ধীরে তাঁর প্রভাব কমতে থাকে।
২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের উত্থানের সময় তোফায়েল আহমেদকে অনেক পর্যবেক্ষক দলের পুরোনো প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে দেখেছেন।
সমালোচকদের মতে, তিনি আওয়ামী লীগের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির বিরোধিতা করেননি। বরং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনগুলোর বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্যও প্রায়ই আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তাঁর সমর্থকদের দাবি, তিনি দলীয় আদর্শের প্রতি অনুগত ছিলেন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
তোফায়েল আহমেদকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনায় আরেকটি বিষয় উঠে এসেছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, স্বাধীনতার পর প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়নি।
তাদের মতে, বিভিন্ন সময় ছাত্রনেতা বা রাজনৈতিক কর্মীদের প্রশাসনিক কাঠামোয় প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা দেখা গেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার প্রশ্নটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের সংখ্যা আরও কমে গেল।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে প্রশংসা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে তীব্র সমালোচনা। গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতা, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রীয় ব্যক্তি, রক্ষীবাহিনী বিতর্কের আলোচিত চরিত্র এবং দীর্ঘদিনের সংসদ সদস্য—সব মিলিয়ে তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি জটিল ও বহুমাত্রিক চরিত্র হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্ভর করবে ভবিষ্যতের গবেষণা, নতুন তথ্য-উপাত্ত এবং স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ওপর। কারণ তোফায়েল আহমেদের জীবনকাহিনি মূলত বাংলাদেশের রাষ্ট্র, ক্ষমতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতন্ত্রের দীর্ঘ ও অসমাপ্ত যাত্রারই প্রতিচ্ছবি।