ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ রুখতে আমরা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা কঠোর শাস্তির কথা বলি। কিন্তু কেউ কি কখনো হিসাব করে দেখেছে, ভাঙা জানালা মেরামতের পেছনে ছাড় হওয়া কোটি টাকার বাজেটের গতিপথ কোথায়?
রাত তখন দেড়টার কিছু বেশি। চট্টগ্রামগামী তূর্ণা এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর রেলস্টেশন অতিক্রম করছে।
জানালার পাশের আসনে বসে ছিলেন আয়কর আইনজীবী শ্যামল চন্দ্র দাস। হঠাৎ বাইরে থেকে ছুড়ে মারা একটি পাথর জানালার কাঁচ ভেঙে তার ডান চোখে এসে আঘাত করে।
রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। দীর্ঘ অস্ত্রোপচারের পরও চিকিৎসকেরা তার চোখটি আর রক্ষা করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত সেটি অপসারণ করতে হয়।
একজন মানুষ তার একটি চোখ হারালো। একটি পরিবার চিরতরে অন্ধকারে ডুবে গেল।
সংবাদপত্রে খবরটা ছাপা হলো। পুলিশ কিছুটা তৎপরতা দেখাল। তারপর সবকিছু আবার আগের মতোই স্বাভাবিক হয়ে গেল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ট্রেনের ওই ভাঙা জানালাটা কি শুধুই একটা ‘দুর্ঘটনা’? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত ও অদেখা অর্থনীতি?
কাঁচ ভাঙলো। তারপর কী হয়?
রেলওয়ের নিজস্ব কোনো কারখানা নেই যেখান থেকে প্রতিদিন জানালার কাঁচ তৈরি হবে। দরকার ঠিকাদার। ভাঙা জানালা মেরামতের টেন্ডার হয়। বাজেট বরাদ্দ হয়। ঠিকাদার কাজ পায়, কাঁচ বসে, বিল পাস হয়।
এখানেই একটু থামা দরকার।
এই যে একটা পয়সার প্রবাহ বা ‘মানি ট্রেইল’ তৈরি হলো, এটা কি বন্ধ হওয়া উচিত? একটু গভীরে ভাবা যাক। যদি পাথর নিক্ষেপ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তো এই মেরামতের বাজেটটাও অকেজো হয়ে যাবে। অর্থাৎ, যারা এই মেরামতের কাজ থেকে লাভবান হয়, তাদের কাছে এই ‘সমস্যা’টা কি আসলেই সমস্যা? নাকি এটি তাদের কাছে একটা নিয়মিত ‘রেভিনিউ স্ট্রিম’ বা আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে?
অর্থনীতির ভাষায় একে বলা যায় ‘ব্রোকেন উইন্ডো ইনসেনটিভ’। সমস্যা যত দীর্ঘায়িত হবে, রেভিনিউ স্ট্রিম তত সচল থাকবে। এই বিষয়টি নিয়ে একটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করে দিলে রেলওয়ের মেরামত খাতে থাকা এই অদেখা চক্রটির লাভের মুখে আঘাত পড়বে কি না, সেটা খতিয়ে দেখা জরুরি। অনেক সময় সমস্যা দীর্ঘায়িত করার পেছনে এই অর্থনৈতিক স্বার্থই কাজ করে।
যদি ধরেই নেওয়া যাক, রেলওয়ের নিজস্ব বাহিনী দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয় এবং এই অদেখা চক্রকে ভাঙতে হবে, তাহলে বিকল্প কী?
সমাধানটা হতে পারে নীতিগত ও কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে।
বর্তমানে ট্রেনের জানালা ভাঙার মেরামত ব্যয় সরাসরি রেলওয়ের জাতীয় বাজেট থেকে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে পাথর পড়লে, তার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে সারা দেশের ট্যাক্স দেওয়া মানুষেরা । এই নিয়মটা বদলাতে হবে।
যে এলাকার উপর দিয়ে ট্রেন যাওয়ার সময় পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটবে, সেই এলাকার মেরামত ব্যয় রেলওয়ের বাজেট থেকে নয়, বরং ওই এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধির (সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান বা পৌর মেয়র) স্থানীয় উন্নয়ন বাজেট থেকে কাটা হবে।
ব্যাস!
কল্পনা করুন, প্রতি মাসে সংসদ সদস্য বা চেয়ারম্যানের অফিসে রেলওয়ের পাঠানো জানালা মেরামতের বিশাল একটা বিল এসে উপস্থিত। তখন কি তিনি চুপ করে থাকবেন?
তিনি নিজেই এলাকায় বেরিয়ে পড়বেন। কে পাথর ছুড়ছে, কোন বস্তি বা এলাকা থেকে ছুড়ছে, তিনি নিজেই তা বের করবেন। সামাজিক প্রচারণা, স্থানীয় পুলিশ, এমনকি স্থানীয় যুবকদের নিয়ে নজরদারি বাহিনী—সব কিছু তিনি নিজেই নিশ্চিত করবেন। কারণ, তখন সমস্যাটা আর রেলওয়ের সমস্যা থাকবে না।
যখন দায়িত্বটা কেন্দ্রীয় কোনো মন্ত্রণালয়ের না হয়ে সরাসরি স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাঁধে চাপবে, তখন ‘অদেখা লাভবানদের’ চক্রও আর কাজ করবে না। কেননা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি যখন দেখবেন তার নিজের বাজেট থেকে বিল কাটা পড়ছে, তখন তিনি ঠিকাদারদের সেই বাজেট থেকে বঞ্চিত করে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান করতে বাধ্য হবেন।
শ্যামল চন্দ্র দাসের হারানো চোখটা আর ফিরে আসবে না। তূর্ণা এক্সপ্রেসের ওই ভাঙা জানালার কাঁচ হয়তো নতুন কাঁচ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ঠিকাদার হয়তো তার বিলও পেয়ে গেছেন। চক্রটা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
সমস্যার সমাধান খুঁজতে হলে শুধু পাথরের দিকে তাকালে হবে না, তাকাতে হবে সেই পাথরের আঘাতে তৈরি হওয়া টাকার থলের দিকেও। কারণ, অর্থনীতির হিসাব মেলাতে পারলে তবেই হয়তো বন্ধ হবে পাথরের এই মৃত্যুখেলা।