২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কার আনা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং তথ্য বিনিময়ের বাধা দূর করা। কিন্তু দুই দশকেরও বেশি সময় পরও সেই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। বরং সিআইএ, এনএসএ, ডিএনআই এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব এখনো অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই টার্ফ ওয়ার বা কর্তৃত্বের লড়াই শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
১১ সেপ্টেম্বরের হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রায় স্বাধীনভাবে কাজ করত। এফবিআই, সিআইএ ও এনএসএ নিজেদের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করলেও পারস্পরিক সমন্বয় ছিল সীমিত। পরে তদন্তে দেখা যায়, বিভিন্ন সংস্থার হাতে থাকা তথ্য একত্রিত করা গেলে হামলার পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব হতে পারত।
এই ব্যর্থতার পর ২০০৪ সালে ইন্টেলিজেন্স রিফর্ম অ্যান্ড টেররিজম প্রিভেনশন অ্যাক্ট (IRTPA) পাস হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয় ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স (DNI) পদ। নতুন এই কাঠামোর উদ্দেশ্য ছিল গোটা মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়কে একীভূত নেতৃত্বের আওতায় আনা।
তবে আইনটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রাখা হয়। সেখানে বলা হয়, ডিএনআই তার ক্ষমতা প্রয়োগ করবে এমনভাবে যাতে বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের স্বতন্ত্র কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন না হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিধান পরবর্তীতে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে।
ডিএনআই ও সিআইএর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিরোধগুলোর একটি ছিল বিদেশে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিনিধি বা স্টেশন চিফ নিয়োগ নিয়ে।
২০০৯ সালে তৎকালীন ডিএনআই ডেনিস ব্লেয়ার একটি গোপন নির্দেশনা জারি করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, বিদেশে স্টেশন চিফ নিয়োগের ক্ষমতা ডিএনআইয়েরও রয়েছে।
সিআইএ পরিচালক লিওন পানেটা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তার মতে, বিদেশে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মূল দায়িত্ব যেহেতু সিআইএর, তাই এ ধরনের নিয়োগের ক্ষমতাও তাদের হাতে থাকা উচিত।
কয়েক মাস ধরে চলা এই বিরোধের পর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন শেষ পর্যন্ত সিআইএর অবস্থানকে সমর্থন করে। ফলে স্টেশন চিফ নিয়োগের ঐতিহ্যগত ক্ষমতা সিআইএর কাছেই থেকে যায়।
ডিএনআই প্রতিষ্ঠার পরও গোয়েন্দা বাজেটের বড় অংশ তার নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মার্কিন বিদেশি গোয়েন্দা বাজেটের অধিকাংশই প্রতিরক্ষা বিভাগের আওতায় ব্যয় হয়।
সাবেক সিআইএ পরিচালক ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস বহু আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, প্রতিরক্ষা বিভাগ সহজে তাদের গোয়েন্দা সম্পদ ও বাজেট কোনো কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষের হাতে ছেড়ে দেবে না।
বাস্তবেও একই চিত্র দেখা যায়। ডিএনআই জন নেগ্রোপোন্তের সময় প্রতিরক্ষা বিভাগ বিভিন্ন হিসাবের মধ্যে অর্থ স্থানান্তর করে এমন ব্যবস্থা তৈরি করে, যাতে ডিএনআই সরাসরি সেই অর্থের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য ভাগাভাগি বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের তথ্যভাণ্ডার আলাদা রাখে এবং সংবেদনশীল তথ্যের প্রবেশাধিকার সীমিত করে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটকে যায়।
২০০৯ সালে ডেট্রয়েটগামী একটি বিমানে সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টার পর তদন্তে দেখা যায়, সিআইএ, এনএসএ এবং ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের মধ্যে তথ্য বিনিময়ে গুরুতর ঘাটতি ছিল। সিনেটের তদন্ত প্রতিবেদনে এনসিটিসির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও সীমিত সম্পদের বিষয়টিও উঠে আসে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মেরুকরণ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে।
রাশিয়ার নির্বাচনী হস্তক্ষেপ, সাইবার নিরাপত্তা, বিদেশি প্রভাব এবং নির্বাচন সংক্রান্ত গোয়েন্দা মূল্যায়ন নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। সমালোচকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে পড়েছে।
ফলে শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়, কোন সংস্থা কোন ব্যাখ্যা বা ন্যারেটিভ সামনে আনবে—সেটিও প্রতিযোগিতার একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
বিভিন্ন সময়ে ডিএনআইয়ের কার্যালয় বা ওডিএনআইয়ের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যাশিত সমন্বয় নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে এটি অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক স্তর তৈরি করেছে।
একাধিক গবেষক মনে করেন, একই ধরনের কাজ বিভিন্ন সংস্থায় সমান্তরালভাবে পরিচালিত হওয়ায় অর্থ ও জনবল উভয়ের অপচয় হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় IRTPA আইনে সংশোধন আনা জরুরি। তারা ডিএনআইয়ের ক্ষমতা আরও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার পরামর্শ দিয়েছেন।
কেউ কেউ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরও কেন্দ্রীভূত করার পক্ষে মত দিয়েছেন। আবার অনেকে গোয়েন্দা সম্প্রদায়ে তথ্য বিনিময় ও যৌথ কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সাবেক ডিএনআই জেমস ক্ল্যাপার তার দায়িত্বকালে সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর কিছু উদ্যোগও গ্রহণ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বা নতুন আইন একাই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দরকার সাংগঠনিক সংস্কৃতিতে।
যতদিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিজেদের তথ্য ও ক্ষমতা রক্ষার মানসিকতা থেকে বের হয়ে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারবে, ততদিন সমন্বয়ের সংকট থেকে যাবে।
৯/১১ কমিশন দুই দশক আগে যে “সংযোগ স্থাপনের” আহ্বান জানিয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। আর এই ব্যর্থতার সুযোগ নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব যদি অব্যাহত থাকে, তবে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।