ইউরোপের ছোট্ট বাল্টিক দেশ এস্তোনিয়া এখন এক নীরব কিন্তু গভীর সংকটের মুখোমুখি। যুদ্ধ নয়, দেশটির প্রধান উদ্বেগ হয়ে উঠেছে দ্রুত কমে যাওয়া জনসংখ্যা। এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর জন্য নতুন সদস্য সংগ্রহ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
এস্তোনিয়ার জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ। দেশটির জন্মহার দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী। একসময় প্রতি বছর প্রায় ১৫ হাজার ছেলে শিশু জন্ম নিত। বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজারে। দেশের মোট প্রজনন হার বা ফার্টিলিটি রেট এখন ১.৩। অথচ জনসংখ্যাকে স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন অন্তত ২.১।
জনসংখ্যা হ্রাসের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়। এস্তোনিয়ার ডিফেন্স রিসোর্সেস এজেন্সির প্রধান আনু রান্নাভেস্কি সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, ২০৪০ সালের মধ্যে শুধুমাত্র পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার ওপর নির্ভর করে সেনাবাহিনীর বার্ষিক ৪ হাজার ১০০ সদস্য সংগ্রহের লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হবে না।
বর্তমানে এস্তোনিয়ায় ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী পুরুষদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু রয়েছে। নারীরা চাইলে স্বেচ্ছায় এতে অংশ নিতে পারেন। তবে প্রতি বছর মাত্র ৪৫ থেকে ৬০ জন নারী এই কর্মসূচিতে যোগ দেন। এছাড়া অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ড্রপআউটের হারও বেশ উচ্চ। অনেক ক্ষেত্রে তা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
এই বাস্তবতায় দেশটিতে নারীদের জন্যও বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালুর আলোচনা জোরালো হয়েছে। বিষয়টি আর শুধু তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়। নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও এটি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এস্তোনিয়ার সাবেক প্রধান বিচারপতি রাইট মারুস্তে মনে করেন, শুধুমাত্র পুরুষদের ওপর দেশরক্ষার দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া সমতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার মতে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে শারীরিক শক্তির চেয়ে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন পরিচালনা এবং তথ্য বিশ্লেষণের মতো দক্ষতার গুরুত্ব অনেক বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, এস্তোনিয়ার সংকট শুধু সামরিক নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জনমিতিক চ্যালেঞ্জ। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ দেশটির জনসংখ্যা ৭ লাখেরও নিচে নেমে যেতে পারে বলে বিভিন্ন জনসংখ্যা পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে ইউরোপের কয়েকটি দেশ বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় নারী-পুরুষ সমান অংশগ্রহণের নীতি গ্রহণ করেছে। নরওয়ে ২০১৫ সালে এবং সুইডেন পরবর্তীতে জেন্ডার-নিউট্রাল কনস্ক্রিপশন ব্যবস্থা চালু করে। এস্তোনিয়াও এখন একই পথে এগোচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও দেশটির ওপর চাপ বাড়িয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত ভাগ করে নেওয়া এস্তোনিয়া ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টলাইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ইউক্রেন যুদ্ধের পর নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ফলে পর্যাপ্ত সামরিক জনবল নিশ্চিত করা দেশটির জন্য কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এস্তোনিয়ার অভিজ্ঞতা শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়। ইউরোপের বহু দেশই নিম্ন জন্মহার ও বয়স্ক জনসংখ্যার চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ভবিষ্যতে এসব দেশের অনেককেই প্রতিরক্ষা নীতি, শ্রমবাজার এবং সামাজিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে।
এস্তোনিয়া সেই পরিবর্তনের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে আছে। আর জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলায় দেশটি যে সিদ্ধান্তই নিক, তা ইউরোপের অন্যান্য দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।