জীবনানন্দের কাব্যজগতকে পর্দায় ধরার সাহসী চেষ্টা ‘বনলতা সেন’

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম রহস্যময় কবিতা বনলতা সেন-কে কেন্দ্র করে নির্মিত একই নামের সিনেমা মুক্তির পর দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আলোচনা, বিভ্রম, মুগ্ধতা এবং বিতর্ক। নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল এই সিনেমায় কেবল একটি কবিতাকে দৃশ্যমান করেননি, বরং কবি জীবনানন্দ দাশ-এর কাব্যজগত, নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি, প্রেম ও হ্যালুসিনেশনের ভেতর দিয়ে তৈরি করেছেন এক পরাবাস্তব অভিজ্ঞতা।

সিনেমার শুরু থেকেই দর্শককে টেনে নেওয়া হয় এক অদ্ভুত কাব্যিক জগতে। সমুদ্রতীরে ছড়িয়ে থাকা মৃত হাঁস, কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা বনলতা, আর মহীনের ঘোরগ্রস্ত ছুটে চলা— প্রথম দৃশ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাস্তব আর কল্পনার মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে আছে এই গল্প। এখানে মহীন নামের চরিত্রটি যেন জীবনানন্দেরই আরেক রূপ, আবার কখনো মনে হয় তিনি কবির কল্পনার মানুষ।

সিনেমাটির বড় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে এর ভিজ্যুয়াল ভাষা, আবহসঙ্গীত এবং সংলাপ। পুরো চলচ্চিত্রজুড়ে জীবনানন্দের কবিতার রেফারেন্স, নিঃস্তব্ধতা, পিয়ানোর মৃদু সুর এবং প্রতীকী দৃশ্য নির্মাণ দর্শকদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী আবেশ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সংগীত পরিচালক বাপ্পা মজুমদার-এর কাজকে অনেকে সিনেমার অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন। সিনেমায় ব্যবহৃত একমাত্র গানটিকেও দর্শকরা বলছেন “পোয়েটিক সিনেমার চূড়ান্ত মুহূর্ত”।

অভিনয়ের জায়গাতেও প্রশংসা পেয়েছেন বেশ কয়েকজন শিল্পী। মহীন চরিত্রে সোহেল মণ্ডল-এর অভিনয়কে অনেকেই সিনেমার প্রাণ বলে মনে করছেন। অন্যদিকে জীবনানন্দ দাশ চরিত্রে খায়রুল বাশার নিজের চেহারা, হাঁটা-চলা ও অভিব্যক্তিতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। বনলতা সেন চরিত্রে নাবিলা সংযত অভিনয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। এছাড়া শোভনা চরিত্রে রুপন্তি আকিদ এবং অন্যান্য শিল্পীদের অভিনয়ও আলোচনায় এসেছে।

তবে প্রশংসার পাশাপাশি সিনেমাটি নিয়ে কিছু সমালোচনাও রয়েছে। বিশেষ করে শেষ দৃশ্যের দ্রুত সমাপ্তি অনেক দর্শকের কাছে অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে। সমালোচকদের মতে, গল্প যখন গভীর আবেগের জায়গায় পৌঁছেছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ সমাপ্তি দর্শকের অনুভূতির রেশ ধরে রাখতে পারেনি। এছাড়া কিছু জায়গায় অতিরিক্ত তথ্য সরাসরি সংলাপে বলে দেওয়াকে “ইনফো ডাম্প” হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ।

চলচ্চিত্রটির আরেকটি আলোচিত দিক হচ্ছে বাস্তব ও অবাস্তবের মিশ্রণ। কখনো মনে হয় গল্পটি মহীনের, আবার কখনো জীবনানন্দের। এই বিভ্রমই সিনেমাটিকে আলাদা করেছে প্রচলিত বাংলা চলচ্চিত্র থেকে। সিনেমাটিতে বারবার ফিরে এসেছে খুঁজে পাওয়া আর হারিয়ে ফেলার অনুভূতি— যা মূলত জীবনানন্দের কবিতারই একটি স্থায়ী আবহ।

প্রেক্ষাগৃহে দর্শক প্রতিক্রিয়াও ছিল মিশ্র। হাউজফুল শোতে কেউ মুগ্ধ হয়ে দেখেছেন পুরো সিনেমা, আবার কেউ হল থেকে বেরিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন— “এটা কি আদৌ সিনেমা?” তবে এ নিয়ে দ্বিমত কম যে, বাংলা চলচ্চিত্রে এমন কাব্যিক ও প্রতীকনির্ভর নির্মাণ খুব কমই দেখা যায়।

সমালোচকদের মতে, বনলতা সেন নিখুঁত সিনেমা না হলেও এটি একটি সাহসী প্রচেষ্টা। কারণ, জীবনানন্দ দাশের মতো কবির জগৎকে পুরোপুরি ধারণ করা হয়তো কোনো একক চলচ্চিত্রের পক্ষে সম্ভব নয়। সেই অসম্পূর্ণতাকেই শক্তিতে পরিণত করেছে এই সিনেমা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *