২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর। ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের উরি সেনাঘাঁটিতে হামলার পর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের কেরালা রাজ্যে এক জনসভায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেছিলেন — পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হবে। প্রায় এক দশক পরে, কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, মোদির সেই প্রচেষ্টা উল্টোফল দিয়েছে। পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়নি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার কূটনৈতিক প্রভাব আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত একটি মোড় নিয়ে আসে। পাহালগাম হামলার পর ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক অভিযান চালায়। কিন্তু ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়।
এই সংঘাতের সময় পাকিস্তানের সামরিক সাফল্য আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। পাকিস্তান দাবি করে, তারা ভারতের বহু যুদ্ধবিমান, যার মধ্যে ফ্রান্সনির্মিত রাফাল যুদ্ধবিমানও রয়েছে, গুলি করে ভূপাতিত করেছে। ভারত বিমান হারানোর কথা দেরিতে স্বীকার করায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পাকিস্তানের অবস্থান আরও শক্তিশালী মনে হয়।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান আল জাজিরাকে বলেছেন, পাকিস্তান “বৈশ্বিক বর্ণনার যুদ্ধে” জয়ী হয়েছে।
সংঘাতের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। পাকিস্তান তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াশিংটনের ভূমিকা স্বীকার করে এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। পরে পাকিস্তান ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করে।
বিপরীতে, নয়াদিল্লি কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা স্বীকার করতে অস্বীকার করে এবং দাবি করে যুদ্ধবিরতি কেবল দ্বিপাক্ষিক সামরিক যোগাযোগের মাধ্যমে হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প বারবার দাবি করেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই এই যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান গত বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির উভয়েই হোয়াইট হাউস সফর করেছেন।
এদিকে, চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে “অটুট” বলে আখ্যায়িত করেন।
পাকিস্তান কেবল বড় শক্তিগুলোর সঙ্গেই সম্পর্ক জোরদার করেনি, বরং আঞ্চলিক কূটনীতিতেও তার ভূমিকা বেড়েছে। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
এছাড়া, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকার সঙ্গেও পাকিস্তানের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) ব্যর্থতা এবং পাকিস্তানের আঞ্চলিক কূটনৈতিক সাফল্য ভারতের আঞ্চলিক নেতৃত্বের ওপর প্রশ্ন তুলেছে।
পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খান আল জাজিরাকে বলেছেন, পাকিস্তানের ওয়াশিংটনে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অর্জন “চতুর কূটনীতির” ফল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোদির পাকিস্তানবিরোধী কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কয়েকটি দুর্বলতা ছিল:
প্রমাণের অভাব: পাহালগাম হামলায় পাকিস্তানের জড়িত থাকার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয় ভারত।
একতরফা পদক্ষেপ: ইন্দুস জলবন্টন চুক্তি স্থগিত করার মতো পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ভারতকে আরও আক্রমণাত্মক প্রতিপন্ন করে।
সামরিক ব্যর্থতা: মে ২০২৫-এর সংঘাতে ভারতের সামরিক পশ্চাদপদতা তার কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে।
আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা: সার্কের পক্ষে না থেকে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে।
প্রায় এক দশক ধরে চলা ভারতের পাকিস্তানবিরোধী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা উল্টোফল দিয়েছে। পাকিস্তান আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন না হয়ে, বরং ওয়াশিংটন, বেইজিং এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে।
মোদির ২০১৬-এর অঙ্গীকার এবং ২০২৬-এর বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান, তা দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণেরই প্রতিফলন। পাকিস্তান এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে — যা মোদির বিচ্ছিন্নকরণ কূটনীতির সবচেয়ে বড় পরাজয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: আল জাজিরা