নুরুল ইসলাম বাবুল
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর আসন্ন কোরবানি ঈদকে ঘিরে মুসলিম সমাজের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা ও ভয়ের আবহ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, আঞ্চলিক পত্রিকা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যাচ্ছে—কোরবানির পশু কেনাবেচা, পরিবহণ, জবাই, ধর্মীয় আচার পালনের স্বাধীনতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা—সবকিছু নিয়েই মুসলিমদের মধ্যে আশঙ্কা বাড়ছে।
বিজেপি সরকার দাবি করছে, তারা কেবল পুরোনো আইন কার্যকর করছে এবং অবৈধ পশু পাচার রোধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দল, মানবাধিকারকর্মী এবং মুসলিম সমাজের একাংশের অভিযোগ, এসব পদক্ষেপের সময় ও ধরন এমন যে তা মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিকে চাপে ফেলছে এবং কোরবানি ঈদের স্বাভাবিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার নতুন করে কঠোরভাবে “ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যানিম্যাল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্ট, ১৯৫০” কার্যকর করতে শুরু করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, চৌদ্দ বছরের কম বয়সী গরু বা কর্মক্ষম পশু জবাই করা যাবে না এবং পশু জবাইয়ের আগে সরকারি ভেটেরিনারি সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে প্রকাশ্যে পশু জবাইয়ের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই মুসলিম সমাজে আশঙ্কা ছড়ায় যে কোরবানির সময় প্রশাসনিক বাধা, পুলিশি নজরদারি এবং আইনি জটিলতা আরও বাড়তে পারে।
সংবাদমাধ্যমগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক এলাকায় গবাদিপশু পরিবহণকারী গাড়ি আটকানো হচ্ছে এবং পশুর কাগজপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছে। মানিকন্ট্রোলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্রর মন্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, গরুর “জন্ম সনদ” পর্যন্ত দেখতে চাওয়া হয়েছে।
এই ধরনের বক্তব্য সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে এক ধরনের ভীতির পরিবেশ তৈরি করেছে। কারণ বাস্তবে গ্রামীণ এলাকায় অধিকাংশ গবাদিপশুর কোনো জন্মসনদ থাকে না। ফলে অনেক ব্যবসায়ী ও ক্রেতা আশঙ্কা করছেন, কোরবানির পশু নিয়ে পথে বের হলেই হয়রানির মুখে পড়তে হতে পারে।
কোরবানি ঈদের আগে রাজ্যজুড়ে গরু বিক্রি ও জবাই নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে অনেক মুসলিম পরিবার কোরবানি দেওয়া নিয়েই অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বিভিন্ন মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান এবং দোকানপাট ভাঙার ঘটনাও আতঙ্ক বাড়িয়েছে। অনেকের মতে, প্রশাসনের এই কঠোর মনোভাব মুসলিমদের মনে এমন ধারণা তৈরি করছে যে তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোকে বিশেষভাবে নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে।
কোরবানির পশুর বাজারও এই পরিস্থিতিতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মুসলিম নেটওয়ার্ক টিভি এবং দ্য ফেডারেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশি কড়াকড়ি ও প্রশাসনিক নজরদারির কারণে বহু পশু ব্যবসায়ী বাজারে পশু আনতে সাহস পাচ্ছেন না। এতে মুসলিম ক্রেতাদের জন্য পশুর দাম বেড়ে যাচ্ছে এবং পর্যাপ্ত পশু পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠছে।
বহু মুসলিম পরিবার, যারা সারা বছর ধরে সামান্য সঞ্চয় করে কোরবানির প্রস্তুতি নেয়, তারা এবার বাড়তি আর্থিক চাপে পড়েছে। শুধু মুসলিমরাই নন, বহু হিন্দু পশু ব্যবসায়ীও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বহু হিন্দু ব্যবসায়ী অভিযোগ করছেন যে মুসলিম ক্রেতারা ভয় পাচ্ছেন বলে বাজারে গরু বিক্রি কমে গেছে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়ছে।
কিন্তু মুসলিম সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তাদের একটি ধর্মীয় কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি এতটাই সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে যে কলকাতার বিভিন্ন ইমাম ও মুসলিম ধর্মীয় নেতা মানুষকে আইন মেনে কোরবানি করার আহ্বান জানাচ্ছেন। কেউ কেউ গরুর বদলে ছাগল বা ভেড়া কোরবানি দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন।
এই আহ্বানের পেছনে মূল কারণ ছিল সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানো এবং প্রশাসনিক ঝামেলা থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে রাখা। কিন্তু সমালোচকদের মতে, একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে তাদের ঐতিহ্যগত প্রথা পরিবর্তনের আহ্বান জানাতে বাধ্য হওয়া নিজেই উদ্বেগজনক।
কিছু সংবাদমাধ্যমে আরও দাবি করা হয়েছে যে, কোরবানি ঈদের আগে “রাস্তার ওপর নামাজ”, “গরু পাচার” এবং “অবৈধ পশুর বাজার” নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে প্রচার করা হচ্ছে। মানিকন্ট্রোলের এক প্রতিবেদনে বিজেপি নেতাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, রাস্তার ওপর নামাজ বরদাস্ত করা হবে না এবং অবৈধ পশুর বাজারের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে।
মুসলিমদের একাংশ মনে করছেন, এই ধরনের বার্তা জনমানসে এমন একটি ধারণা তৈরি করছে যেখানে মুসলিম ধর্মীয় আচরণকে আইনশৃঙ্খলার সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। রেডিটসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কোরবানি, গরু বিক্রি এবং মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। কোথাও মুসলিমদের বিরুদ্ধে কটূক্তি, কোথাও আবার সরকারের সমালোচনা দেখা যাচ্ছে।
এই অনলাইন উত্তেজনা বাস্তব সমাজেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন।
মুসলিম সমাজের আরও একটি বড় উদ্বেগ হলো প্রশাসনিক বৈষম্যের অনুভূতি। বিজেপি নেতৃত্বের কিছু বক্তব্যে “তোষণনীতি বন্ধ”, “এক সম্প্রদায়ের সরকার নয়” ইত্যাদি মন্তব্য উঠে এসেছে। যদিও সরকার বলছে, তারা সবার জন্য সমান আইন প্রয়োগ করছে; কিন্তু মুসলিমদের একাংশ মনে করছেন, এই ভাষ্য রাজনৈতিকভাবে এমন এক পরিবেশ তৈরি করছে যেখানে মুসলিম পরিচয়কে আলাদা করে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ভারতের সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার। কোরবানি ঈদ মুসলিমদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবের সঙ্গে শুধু ধর্ম নয়; সামাজিক সম্পর্ক, দান, দরিদ্র মানুষের মধ্যে মাংস বিতরণ এবং পারিবারিক আবেগও জড়িত।
তাই কোরবানিকে ঘিরে অতিরিক্ত নজরদারি বা প্রশাসনিক কড়াকড়ি মুসলিমদের মনে স্বাভাবিকভাবেই অসন্তোষ সৃষ্টি করছে। বিশেষত যখন এই কড়াকড়ি এমন সময়ে কার্যকর করা হয়, যা সরাসরি ঈদের প্রস্তুতির সঙ্গে মিলে যায়।
অন্যদিকে সরকারের সমর্থকেরা বলছেন, আইন বহুদিন ধরেই ছিল, এখন শুধু তা কার্যকর করা হচ্ছে। তাদের মতে, অবৈধ পশু পাচার বন্ধ করা, পশু কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা সরকারের দায়িত্ব।
কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য, যদি সত্যিই আইন প্রয়োগই উদ্দেশ্য হয়, তবে তা সারা বছর সমানভাবে হওয়া উচিত ছিল; কোরবানি ঈদের ঠিক আগে আকস্মিক কড়াকড়ি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন নিম্নবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারগুলো। কারণ কোরবানি ঈদের সময় তারা সাধারণত স্থানীয় পশুর হাট থেকে কিস্তিতে বা ধার করে পশু কিনে থাকেন।
কিন্তু এ বছর প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং বাজারে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক হাটে পশুর সংখ্যা কমে গেছে। ফলে দাম বেড়েছে এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে কোরবানি দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
অনেকেই আশঙ্কা করছেন, শেষ মুহূর্তে যদি পুলিশি অভিযান বা পরিবহণে বাধা সৃষ্টি হয়, তাহলে কেনা পশু নিয়েও সমস্যায় পড়তে হতে পারে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যাচ্ছে, অনেক পরিবার এবার ছাগল বা ছোট পশুর দিকে ঝুঁকছে, যদিও তাদের মূল পরিকল্পনা ছিল গরু কোরবানি দেওয়া।
মুসলিম সমাজের মধ্যে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো সামাজিক নিরাপত্তা। কোরবানি ঈদের সময় অনেক এলাকায় গুজব, উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক উসকানির আশঙ্কা থাকে।
বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে অতীতে গরু পরিবহণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা কিংবা গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে বলে বহু মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের একাংশ ভয় পাচ্ছেন যে সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
যদিও প্রশাসন বলছে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে তারা কঠোর; কিন্তু সাধারণ মানুষের একাংশ মনে করছেন, কড়াকড়ির ভাষা ও ধরন পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলছে।
কোরবানি ঈদকে ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গেও হাজার হাজার মানুষের জীবিকা জড়িত। পশুর হাট, খাদ্য সরবরাহ, পরিবহণ, কসাই, চামড়া ব্যবসায়ী, ছোট দোকানদার—সব মিলিয়ে একটি বিশাল অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয়।
এবারের অনিশ্চয়তার কারণে সেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ধাক্কা লাগছে। বহু ছোট ব্যবসায়ী বলছেন, মানুষ ভয়ে আগেভাগে বাজারে আসছেন না। আবার কেউ কেউ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন প্রশাসনের পরিস্থিতি বোঝার জন্য। এর ফলে পুরো বাজার ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আরও দেখা গেছে, মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও সমাজকর্মীদের একাংশ সরকারের সঙ্গে আলোচনার দাবি তুলেছেন। তাদের মতে, আইন প্রয়োগ করতে হলে তা নিয়ে পরিষ্কার নির্দেশিকা আগে থেকেই জানানো উচিত ছিল।
কোথায় পশু জবাই করা যাবে, কী ধরনের কাগজ লাগবে, কীভাবে পশু পরিবহণ করা যাবে—এসব বিষয়ে প্রশাসনের সুস্পষ্ট ও সহজ নির্দেশনা না থাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। গ্রামীণ এলাকার সাধারণ মানুষ অনেক সময় আইনি ভাষা বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বোঝেন না। ফলে তারা সহজেই ভয় ও গুজবের শিকার হন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, কোরবানি ঈদকে ঘিরে এই বিতর্ক আসলে বৃহত্তর রাজনৈতিক মেরুকরণের অংশ। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই গরু রক্ষা, অবৈধ পাচার রোধ এবং ধর্মীয় তোষণের বিরোধিতার মতো বিষয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে। পশ্চিমবঙ্গেও সেই একই রাজনৈতিক ভাষা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে সমালোচকেরা দাবি করছেন।
অন্যদিকে বিজেপির সমর্থকেরা বলছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করা হচ্ছে না। এই দুই বিপরীত অবস্থানের মধ্যে পড়ে সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্নটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রামে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে পশুর ব্যবসা, কৃষিকাজ এবং স্থানীয় বাজারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে সেই সম্পর্কের ওপরও প্রভাব পড়ে।
কিছু এলাকায় মুসলিমরা আশঙ্কা করছেন, কোরবানি নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আবার অনেক হিন্দু ব্যবসায়ীও বলছেন, দীর্ঘদিনের ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হলে তার প্রভাব ভবিষ্যতের ব্যবসায় পড়বে।
মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তারা একদিকে মানুষকে আইন মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন, অন্যদিকে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন। অনেক মসজিদে ইতিমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে যে কোনো উসকানিতে পা না দিতে এবং কোরবানির সময় পরিচ্ছন্নতা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।
এই ধরনের উদ্যোগ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে অনেকের মতে, শুধুমাত্র মুসলিম সমাজকে সংযমের বার্তা দিলেই হবে না; রাজনৈতিক দল এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সমান দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করিয়ে দিয়েছেন যে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো আইন কার্যকর করা অবশ্যই সরকারের অধিকার, কিন্তু সেই প্রয়োগ যেন কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ভীতি বা বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি না করে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে উৎসবের সময় প্রশাসনিক ভাষা, পুলিশি আচরণ এবং রাজনৈতিক বক্তব্য অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে পরিচালনা করা দরকার।
বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে কোরবানি ঈদ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। তাই সমস্যার সমাধানও হতে হবে সংলাপ, স্বচ্ছতা এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।
মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা, আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল পশ্চিমবঙ্গ তার ঐতিহ্যগত সহাবস্থানের সংস্কৃতিকে অটুট রাখতে পারবে।
এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু সংবাদমাধ্যম বিষয়টিকে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে, আবার কিছু মাধ্যম মুসলিমদের উদ্বেগ ও ভয়ের দিকটি সামনে আনছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং উত্তেজক বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষ আরও আতঙ্কিত হচ্ছেন।
তাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং তথ্য যাচাই এখন খুবই জরুরি। কারণ গুজব বা উসকানিমূলক প্রচার সাম্প্রদায়িক সম্পর্ককে সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে যে সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত শান্তি ও সহাবস্থানের পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতেও বহু নাগরিক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং মানবাধিকার সংগঠন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন।
তাদের বক্তব্য, কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বিভাজনমূলক রাজনীতি রাজ্যের দীর্ঘদিনের সামাজিক ঐতিহ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতা এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে সংযম ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মুসলিম সমাজের কাছে শুধু একটি উৎসবের প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ নয়; বরং নিজেদের নাগরিক অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে উদ্বেগের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
কোরবানি ঈদকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই অনিশ্চয়তা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা ভবিষ্যতে সামাজিক বিশ্বাস ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সময় থাকতে সংলাপ, আইনের স্বচ্ছ প্রয়োগ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সরকারেরও উচিত স্পষ্টভাবে জানানো যে কোনো বৈধ ধর্মীয় আচারে বাধা দেওয়া তাদের উদ্দেশ্য নয়। প্রশাসনিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সমতা বজায় থাকলে মানুষের মধ্যে আস্থা বাড়বে।
পশ্চিমবঙ্গের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি এবং সম্প্রীতির ঐতিহ্য রক্ষা করার স্বার্থে সকল পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।
কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত এই পরিস্থিতি শুধু একটি সাময়িক রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি ভবিষ্যতের সামাজিক সম্পর্ক, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নকেও সামনে এনে দিয়েছে। তাই শান্তি, ন্যায় এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতেই এই সংকটের সমাধান খুঁজে বের করা দরকার।
পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের জন্য সময় এখন সত্যিই অত্যন্ত সংবেদনশীল, যা ভ্রাতৃত্বের টানে বাংলাদেশের মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকেও নাড়া দিতে পারে।
নুরুল ইসলাম বাবুল : শিক্ষক ও গবেষক