তাপস চন্দ্র সরকার
আমরা যখন ছোটবেলায় রূপকথার গল্প শুনতাম, সেখানে একজন ন্যায়পরায়ণ রাজার কথা থাকত। যিনি খুব শান্ত চোখে প্রজাদের দিকে তাকাতেন আর এক নিমেষে দূর করে দিতেন সব অন্যায়-অবিচার। রূপকথার সেই রাজারা তো এখন আর নেই, কিন্তু এই জটিল ও রুক্ষ পৃথিবীতে এখনো এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের দেখলে মনে হয়—পৃথিবীতে এখনো সততা আর মানবিকতা হারিয়ে যায়নি। বাংলাদেশের বিচারালয়ের এমনই একজন শান্ত ও দূরদর্শী মানুষের নাম সাউদ হাসান। যিনি বর্তমানে কুমিল্লার পারিবারিক আপীল আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৭৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বরের এক শীতের রাতে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার হরিদাসপুর ইউনিয়নের আড়পাড়া গ্রামের এক মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা মরহুম আলহাজ্ব মো. আব্দুল ওয়াদুদ মোল্লা এবং মাতা আনোয়ার বেগমের ঘরের এই সর্বকনিষ্ঠ সন্তানটি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন একটু অন্যরকম। তাঁর চোখে ছিল এক আশ্চর্য মেধার দীপ্তি। ১৯৯৫ সালে আড়পাড়া ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৯৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাস করার পর তিনি পা রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। সেখান থেকে এলএলবি (অনার্স) এবং এলএলএম—উভয় পরীক্ষাতেই প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
কিন্তু সাউদ হাসানের জ্ঞানের তৃষ্ণা তো শুধু এক জায়গায় থমকে থাকার মতো ছিল না। তিনি ভারতের নালসার আইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বিষয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা করে প্রথম স্থান অধিকার করলেন। এরপর যুক্তরাজ্যের বিশ্বখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পন্ন করলেন বিশেষায়িত কোর্স। দেশ-বিদেশে মোট ৫৪টি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি, যার মধ্যে ভারতের যোধপুর কিংবা ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণগুলো তাঁর প্রজ্ঞাকে করেছে আরও শাণিত। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আইন পড়িয়েছেন, লিখেছেন ‘লিগ্যাল ড্রাফটিং এন্ড কনভেন্সিং’ এবং ‘স্কিলস ইন ট্রায়াল এডভোকেসি’-এর মতো জনপ্রিয় বই।
পেশাজীবনের শুরুতে সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবী হিসেবে কাজ করলেও, ২০০৮ সালে তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসে। রাজবাড়ী, ঢাকা, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম আর কুমিল্লা—যেখানেই তিনি গিয়েছেন, সেখানেই ছড়িয়েছেন এক অদ্ভুত আলোর আভা। তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে তিনি লাভ করেন “প্রধান বিচারপতি পদক”।
আমাদের দেশের আদালতগুলোতে বিচারপ্রার্থী মানুষের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ বড্ড ভারী হয়। বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা মামলার জটলা মানুষের জীবনকে বিষাদময় করে তোলে। বিচারক সাউদ হাসান সেই বিষাদগ্রস্ত মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটাতে চাইলেন। প্রযুক্তির ব্যবহার, নিখুঁত পরিকল্পনা আর সময় ব্যবস্থাপনার এক অদ্ভুত জাদুতে তিনি প্রতিটি আদালতের মামলাজট এক নিমেষে কমিয়ে আনলেন।
কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান লিটন তাঁর প্রশংসা করে বলেন, “বিচারক সাউদ হাসান বিচার বিভাগকে গতিশীল করেছেন। তিনি দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছেন।” আবার সাবেক সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. জহিরুল ইসলাম সেলিম বলেন, “দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।” এত বড় একজন মানুষ, অথচ ব্যক্তিজীবনে তিনি কী আশ্চর্য রকম সাদাসিধে ও মানবিক! তাঁর জীবনসঙ্গী মনিকা খানও একজন বিচারক, যিনি বর্তমানে কুমিল্লার চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এক পুত্র আর এক কন্যাসন্তানকে নিয়ে তাঁদের ছোট্ট, সুন্দর সংসার।
সাউদ হাসান মনে করেন, বিচার করা কোনো একক কাজ নয়, এটি একটি টিমওয়ার্ক। তাঁর নিজের ভাষায়—“যেকোনো মামলা নিষ্পত্তিতে বিচারকের আন্তরিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারা আমার কাছে শুধু দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক কর্তব্য।”
“মানুষের তৈরি আইনের আদালতগুলো বড্ড ঠান্ডা আর নিষ্ঠুর হয়, কিন্তু সেই আদালতে যদি একজন মায়াময় বিচারক বসেন, তবে সেই দেয়ালগুলোও যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।” সাউদ হাসান ঠিক তেমনই একজন মানুষ। বর্তমান সময়ে যখন মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী, তখন তিনি তাঁর সততা, প্রজ্ঞা আর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে উঠেছেন এক পশলা মেঘমুক্ত রোদ আর এক টুকরো পরম আশার আলো।
তাপস চন্দ্র সরকার : আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী ও সংগঠক।