অনিরাপদ ভেষজ ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি, নিরাপদ বিকল্প দেশীয় ফল

বাংলাদেশে ওষুধি গাছ বা মেডিসিনাল প্ল্যান্ট নিয়ে আগ্রহ নতুন নয়। বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি-বেসরকারি তথ্যে বলা হয়, দেশে প্রায় ৭৫০ থেকে ১০০০ প্রজাতির ওষুধি উদ্ভিদ রয়েছে। এসব উদ্ভিদ নিয়ে প্রতিবছর অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ হচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, বাস্তবে এসব উদ্ভিদের কতটুকু নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবহার হচ্ছে?

দেশের কয়েকটি বড় ওষুধ কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে ভেষজ উপাদান ব্যবহার করে ওষুধ তৈরি করছে। এর মধ্যে রয়েছে স্কয়ার, একমি, এসিআই ও ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের মতো প্রতিষ্ঠান। এসব কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে গবেষণা ও মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদন করে।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। শহর ও গ্রামে নানা ধরনের ভেষজ পানীয়, গুঁড়া বা শেকড়-বাকড় অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিক্রি হচ্ছে। রাস্তার পাশে তৈরি অ্যালোভেরার শরবত এর অন্যতম উদাহরণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রস্তুত হয়। ব্যবহৃত পানি, বরফ বা সংরক্ষণ পদ্ধতি কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে।

একই অবস্থা বিভিন্ন লোকজ ভেষজ উপাদানের ক্ষেত্রেও। জ্বর হলে অনেকে কালোমেঘ খায়। আবার শিমুল মূল, মিশ্রিদানা বা নানা ভেষজ মিশ্রণ ফুটপাতে বিক্রি হতে দেখা যায়। কিন্তু এসব পণ্যের সঠিক মাত্রা, বিশুদ্ধতা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষের স্পষ্ট ধারণা নেই। ফলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির ঝুঁকিও থেকে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেষজ মানেই নিরাপদ—এ ধারণা ভুল। অনেক উদ্ভিদ ভুলভাবে গ্রহণ করলে লিভার, কিডনি বা হজমতন্ত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। আবার কিছু ভেষজ অন্য ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়াও করতে পারে।

বাংলাদেশে অশ্বগন্ধার মতো আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাসম্পন্ন উদ্ভিদ থাকলেও, তা থেকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা এখনো তৈরি করা যায়নি। চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।

এ অবস্থায় পুষ্টিবিদ ও স্বাস্থ্যসচেতনদের একটি অংশ দেশীয় ফলকে নিরাপদ প্রাকৃতিক বিকল্প হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, পেয়ারা বা পেঁপের মতো ফল শুধু পুষ্টিকর নয়, এগুলোতে রয়েছে প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও উপকারী উদ্ভিজ উপাদান।

এসব ফলের বড় সুবিধা হলো, এগুলো সাধারণত সরাসরি খাওয়া যায়। অতিরিক্ত সিদ্ধ, রাসায়নিক মিশ্রণ বা অনিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণের দরকার হয় না। ফলে খাদ্যের পুষ্টিগুণ অনেকটাই অক্ষত থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত ফল খাওয়ার বিকল্প নেই। নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, নিরাপদ খাবার ও পুষ্টিকর ফল দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারী।

তাদের মতে, ওষুধি গাছ নিয়ে গবেষণা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সচেতনতা বাড়ানো আরও জরুরি। কারণ ভুল তথ্য বা অনিরাপদ ভেষজ ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তাই শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। আর সেই তালিকায় দেশীয় ফল হতে পারে সবচেয়ে সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর প্রাকৃতিক উৎস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *