বর্তমান ফুটবল বিশ্বে সবচেয়ে ছন্দময় ও আক্রমণাত্মক দলগুলোর একটি স্পেন। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, টেকনিক্যাল দক্ষতা এবং দলগত সমন্বয় বিবেচনায় অনেক বিশ্লেষকের চোখে এবার বিশ্বকাপের অন্যতম বড় দাবিদার ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
বিশেষ করে আক্রমণভাগে স্পেনের গতি, বল কন্ট্রোল এবং উইং প্লে ইতোমধ্যে ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে। অনেকের মতে, ২০১০ সালের বিশ্বজয়ী স্পেনের পর সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল এটি। তবে বর্তমান দলটি আরও ভয়ংকর হয়েছে তরুণ প্রতিভা লামিন ইয়ামালের উপস্থিতিতে।
মাত্র অল্প বয়সেই বার্সেলোনার এই উইঙ্গার বিশ্ব ফুটবলে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন। ড্রিবলিং, বল কন্ট্রোল, দূর থেকে শট এবং অবিশ্বাস্য অ্যাসিস্ট— সব মিলিয়ে লামিনকে ইতোমধ্যে ভবিষ্যৎ সুপারস্টার ধরা হচ্ছে। বিশেষ করে বা পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে তার নিখুঁত পাস অনেক সময় অবিশ্বাস্য মনে হয়।
স্পেনের আক্রমণের সবচেয়ে বড় শক্তি ধরা হচ্ছে লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের বোঝাপড়া। দুইজন ভিন্ন ক্লাবে খেললেও জাতীয় দলে তাদের সমন্বয় দুর্দান্ত। নিকোর গতি এবং লামিনের টেকনিক্যাল স্কিল একসঙ্গে প্রতিপক্ষ ডিফেন্সের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। গত ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে এই জুটির কার্যকারিতা পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে।
তবে কিছু দুশ্চিন্তাও আছে। নিকো উইলিয়ামস গত মৌসুমে ধারাবাহিক ফর্মে ছিলেন না। অন্যদিকে ইনজুরি কাটিয়ে ফিরেছেন লামিন ইয়ামাল। বড় টুর্নামেন্টের চাপ সামলাতে তারা কতটা প্রস্তুত থাকবেন, সেটি এখন দেখার বিষয়।
স্ট্রাইকার পজিশনে স্পেনের ভরসা মিকেল ওয়ারিয়াসাবাল। দীর্ঘদিন ধরে রিয়াল সোসিয়েদাদের হয়ে খেলা এই ফরোয়ার্ডের গতি, পজিশন সেন্স এবং ফিনিশিং দক্ষতা এখনো ইউরোপের সেরাদের মধ্যে ধরা হয়। এছাড়া বার্সেলোনার ফেরান তোরেসও আক্রমণে বড় অস্ত্র। প্রয়োজন হলে বদলি হিসেবেও ম্যাচের গতি বদলে দিতে পারেন তিনি।
মিডফিল্ডে স্পেনের শক্তি আরও গভীর। বার্সেলোনার পেদ্রি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা প্লেমেকারদের একজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। ডিফেন্স ও আক্রমণের মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে তিনি অসাধারণ দক্ষ। একই সঙ্গে গোল করতেও পারেন।
তার পাশে আছেন ব্যালন ডি’অর জয়ী রদ্রি। ইনজুরির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ছন্দ হারালেও অভিজ্ঞতা ও ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে এখনো তিনি অনন্য। এছাড়া দানি ওলমো, মার্টিন জুবিমেন্দি ও মিকেল মেরিনোর মতো মিডফিল্ডার স্পেনকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করেছে।
বিশেষ করে জুবিমেন্দিকে এবার দলের বড় অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। হাই প্রেসিং ফুটবলে তার গতি, ট্যাকল এবং পজিশন সেন্স স্পেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে মেরিনো আকাশে বল দখল এবং হেডে গোল করার দক্ষতায় আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছেন।
ডিফেন্সেও স্পেনের স্কোয়াড শক্তিশালী। পাউ কুবার্সি, আয়মেরিক লাপোর্তে, মার্ক কুকুরেয়া, আলেহান্দ্রো গ্রিমালদো ও এরিক গার্সিয়ার মতো খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া এই রক্ষণভাগ বল কন্ট্রোলে দক্ষ। তবে ফিজিক্যাল লড়াই এবং কর্নার থেকে আসা বলে কিছু দুর্বলতা রয়েছে।
গোলরক্ষক পজিশনে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েও আলোচনা আছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, আর্সেনালের ডেভিড রায়া বর্তমানে স্পেনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক। ওয়ান-টু-ওয়ান পরিস্থিতিতে তার পারফরম্যান্স বিশ্বমানের। তবে কোচের পছন্দ এখনো উনাই সিমন।
কোচ দে লা ফুয়েন্তের বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা দেওয়া। কঠোর ট্যাকটিক্যাল কাঠামোর বদলে তিনি ফ্রি-ফ্লোয়িং ফুটবলে বিশ্বাস করেন। ফলে খেলোয়াড়রা নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারে।
সব মিলিয়ে স্পেন এখন ইউরোপের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দলগুলোর একটি। তরুণ প্রতিভা, অভিজ্ঞ মিডফিল্ড এবং গতিময় আক্রমণভাগ— সবকিছু মিলিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের বড় স্বপ্ন দেখছে স্প্যানিশরা।
ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে সুন্দর ও উপভোগ্য ফুটবল খেলতে পারে স্পেনই।