জার্মান ফুটবলের পুরোনো দাপট কি ফিরবে? 

একসময় ফুটবল বিশ্বে একটি কথা খুব জনপ্রিয় ছিল—“ফুটবল এমন এক খেলা, যেখানে ২২ জন খেলোয়াড় মাঠে নামে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জার্মানিরাই জেতে।” কথাটি বহু বছর ধরে বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি ছিল। কারণ, বিশ্ব ফুটবলে জার্মানির ধারাবাহিকতা, শৃঙ্খলা ও কৌশলগত শক্তি ছিল অন্যদের চেয়ে আলাদা।

কিন্তু সময় বদলেছে। জার্মান ফুটবল এখন আর আগের মতো ভয় জাগাতে পারে না। জিতলেও সেই দাপট দেখা যায় না। তবু ফুটবল বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ এখনো মনে করেন, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সফল কৌশলগত ধারাগুলোর একটি এখনো জার্মান স্কুল অব ফুটবল।

হাই প্রেসিং, দ্রুত ট্রানজিশন, লং বল, উইং দিয়ে আক্রমণ—আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগুলোর বড় অংশ এসেছে জার্মান ঘরানা থেকে।

এই স্টাইলে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা হয়। বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই প্রেসিং শুরু হয়। উইং দিয়ে দ্রুত আক্রমণে গিয়ে কাটব্যাক বা বাইলাইন ক্রস থেকে গোলের সুযোগ তৈরি করা হয়। ডি-বক্সে একজন নাম্বার নাইন প্রস্তুত থাকে ট্যাপ-ইনের জন্য।

বর্তমানে ইউরোপের প্রায় সব বড় দল এই কৌশল ব্যবহার করে। এমনকি লাতিন আমেরিকার দলগুলোর মধ্যেও জার্মান ধাঁচের প্রভাব স্পষ্ট। লিওনেল মেসি-নির্ভর সৃজনশীলতার পাশাপাশি আর্জেন্টিনাও সর্বশেষ বিশ্বকাপে হাই প্রেসিং ও দ্রুত ট্রানজিশনের ওপর ভর করেই সফলতা পেয়েছিল।

অন্যদিকে ব্রাজিল এখনো পুরোপুরি এই মেকানিকাল ফুটবলে অভ্যস্ত হতে পারেনি। ফলে গত দুই দশকে দলটি ধারাবাহিক সাফল্য থেকে অনেকটাই দূরে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ফুটবলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শারীরিক সক্ষমতা, পজিশন সেন্স ও দলগত শৃঙ্খলা। সবসময় অতিরিক্ত প্রতিভাবান খেলোয়াড় লাগে না। বরং প্রয়োজন পরিশ্রমী ও ট্যাকটিক্যালি ডিসিপ্লিনড ফুটবলার।

এই কারণেই ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে জার্মান কোচদের চাহিদা বেড়েছে। কারণ তাদের কৌশল গোলের সুযোগ তৈরি করতে খুব কার্যকর।

বর্তমান জার্মান দলে প্রতিভার অভাব নেই। কিন্তু বড় সমস্যা হচ্ছে, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় একসঙ্গে অফফর্মে আছেন।

ফ্লোরিয়ান উইর্টজ ক্লাব বদলের পর নিজের সেরা ছন্দ ধরে রাখতে পারছেন না। জামাল মুসিয়ালা দীর্ঘ চোট কাটিয়ে ফিরলেও এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেননি। কাই হ্যাভার্টজ ইনজুরির পর আগের ধার হারিয়েছেন। আর জোশুয়া কিমিচ যেন নিজের ছায়ায় পরিণত হয়েছেন। একসময় যাকে বিশ্বের সেরা রাইট ব্যাকদের একজন বলা হতো, এখন তার খেলায় গতি ও ধার দুটোই কমে গেছে।

তবে জার্মান শিবিরে আশার বড় নাম জুলিয়ান নাগেলসম্যান। আধুনিক ফুটবলের অন্যতম মেধাবী তরুণ কোচ হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়। তার বয়স ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর চেয়েও কম। তবু তিনি ইতোমধ্যে ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।নাগলসম্যান জার্মান ফুটবলের দর্শন খুব ভালো বোঝেন। তিনি সাবেক বিশ্বকাপজয়ী কোচ জোয়াকিম লো-এর ফুটবল দর্শনের ভক্ত। তাই ২০১৪ সালের জার্মানির মতো দল গড়ার স্বপ্নও দেখছেন তিনি।

বর্তমান জার্মান দলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তারা ঐতিহ্যগত জার্মান ফুটবলের বাইরে গিয়ে আরও সৃজনশীল ফুটবল খেলতে চায়।

বিশেষ করে মুসিয়ালার মতো খেলোয়াড়রা বল পায়ে রেখে ড্রিবলিং করে স্পেস তৈরি করতে পারেন। অনেক বিশ্লেষক তার খেলাকে “ড্যান্সিং অন দ্য পিচ” বলেও উল্লেখ করেন।

লেরয় সানে এখন আগের মতো দ্রুত না হলেও পরিণত হয়েছেন অনেক। তবে তার বড় দুর্বলতা এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায়। সহজ পাস না দিয়ে কঠিন কোণ থেকে শট নেওয়ার প্রবণতা জার্মানির আক্রমণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

জার্মান ডিফেন্স পুরোপুরি দুর্বল নয়। তবে দ্রুতগতির দলের বিপক্ষে তারা সমস্যায় পড়তে পারে। আন্তোনিও রুডিগার শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং আক্রমণে লিংকআপ করতে পারেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তার ফর্মও ওঠানামার মধ্যে আছে।

মিডফিল্ডে ভিটজ, মুসিয়ালা ও গোরেৎজকার সমন্বয় খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে। এই ত্রয়ী যদি দ্রুত বোঝাপড়া তৈরি করতে পারে, তাহলে ফরোয়ার্ড লাইনে সুযোগ তৈরি হবে অনেক বেশি।

জার্মানির অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ার এখনো দলের অন্যতম বড় শক্তি। ২০১৪ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য নয়ারকে অনেকেই আধুনিক ফুটবলের সেরা গোলরক্ষকদের একজন মনে করেন। বয়স বাড়লেও তার রিফ্লেক্স এখনো বিস্ময় জাগায়। কাছ থেকে নেওয়া শট ঠেকানোর দক্ষতায় তিনি এখনো বিশ্বমানের।

বর্তমান জার্মান দল নিয়ে স্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন। কারণ দলটির মধ্যে সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি অনিশ্চয়তাও রয়েছে।

যদি অফফর্মে থাকা তারকারা বড় মঞ্চে নিজেদের খুঁজে পান, তাহলে জার্মানি আবারও বিশ্ব ফুটবলে ভয়ঙ্কর শক্তি হয়ে উঠতে পারে। তবে সাম্প্রতিক ইউরোপিয়ান ফুটবলের পারফরম্যান্স বিবেচনায় অনেক বিশ্লেষক এখনো জার্মানিকে সম্ভাব্য কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট হিসেবেই দেখছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *