বিশ্ব ফুটবলের বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হিসেবে অনেক ফুটবল বিশ্লেষক দেখেন পর্তুগালের এখনো বিশ্বকাপ না জেতাকে। প্রতিভা, তারকা আর স্মরণীয় প্রজন্মের অভাব কখনোই ছিল না দলটিতে। তবু শেষ হাসি হাসা হয়নি।
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ আজও পর্তুগালের সমর্থকদের মনে এক অপূর্ণ গল্প হয়ে আছে। সেই আসরে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন কিংবদন্তি ইউসেবিও। মোজাম্বিকে জন্ম নেওয়া এই ফরোয়ার্ড ছিলেন আফ্রিকান শিকড় থেকে উঠে আসা এক প্রতীকী চরিত্র।
সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড-এর বিপক্ষে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল। ইংল্যান্ডের হয়ে দুর্দান্ত খেলেছিলেন ববি চার্লটন। পরে বিতর্কিত ফাইনাল জিতে ইংল্যান্ড প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে।
ইউসেবিওর গল্প শুধু ফুটবলের নয়। উপনিবেশিক বৈষম্যের ভেতর থেকে উঠে এসে ইউরোপীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে নিজের প্রতিভা দিয়ে জবাব দেওয়ার গল্পও এটি। অনেক আফ্রিকান সমর্থকের কাছেও তিনি ছিলেন আত্মমর্যাদার প্রতীক।
২০০৬ বিশ্বকাপেও শিরোপার খুব কাছে গিয়েছিল পর্তুগাল। কিন্তু সেমিফাইনালে থেমে যায় দলটি। সেই দলের বড় মুখ ছিলেন লুই ফিগো। তাঁর কান্নাভেজা বিদায় আজও অনেক সমর্থকের মনে গেঁথে আছে।
গত দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলে পর্তুগালকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো। আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা এই তারকা পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। ইউরো চ্যাম্পিয়নও হয়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়াবিদদের একজন তিনি।
তবে বিশ্বকাপ এখনো তাঁর অধরা স্বপ্ন।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, রোনালদোর ক্যারিয়ারে যা কিছু অর্জন আছে, তার মাঝেও বিশ্বকাপের শূন্যতা আলাদা করে চোখে পড়ে। কারণ ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে শিরোপা জেতাই একজন মহান ফুটবলারের পূর্ণতা হিসেবে দেখা হয়।
বর্তমান পর্তুগাল দলকে অনেকেই বিশ্বের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াডগুলোর একটি মনে করেন। বিশেষ করে মিডফিল্ডে দলটির গভীরতা ঈর্ষণীয়।
ব্রুনো ফার্নান্দেস, ভিতিনহা, জোয়াও নেভেস এবং বার্নার্ডো সিলভা— এই চারজনই নিজেদের ক্লাবের মূল শক্তি। ইউরোপের যেকোনো দল এমন একজন খেলোয়াড় পেলেও সেটিকে বড় সম্পদ ধরা হয়।
আক্রমণভাগেও রয়েছে অভিজ্ঞতা ও গতি। রাফায়েল লিও, ফ্রান্সিসকো ট্রিনকাও এবং গনসালো রামোস ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন।
রক্ষণে আছেন রুবেন ডায়াস। আধুনিক ফুটবলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সেন্টার ব্যাক হিসেবে ধরা হয় তাঁকে।
পর্তুগালের বড় শক্তি হলো প্রায় সব পজিশনেই গোল করার ক্ষমতা থাকা। মিডফিল্ডার থেকে ফুলব্যাক— সবাই আক্রমণে অংশ নিতে পারেন।
তবে এটিই কখনো সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক মানসিকতার কারণে খেলোয়াড়রা নিজেদের পজিশন ছাড়েন। এতে রক্ষণে ফাঁক তৈরি হয়। জোয়াও ক্যানসেলো-র মতো আক্রমণপ্রবণ ফুলব্যাকদের কারণে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক ফুটবলে শুধু দক্ষতা নয়, শৃঙ্খলাও গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত প্রেসিং, বল হারালে দ্রুত রক্ষণে ফেরা এবং দলগত ভারসাম্য ছাড়া বড় টুর্নামেন্ট জেতা কঠিন।
বর্তমান কোচ রবার্তো মার্টিনেজ-এর সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো দলটিকে একসঙ্গে খেলানো। তিনি আগে বেলজিয়াম-এর তথাকথিত “সোনালি প্রজন্ম” সামলেছেন। কেভিন ডি ব্রুয়েন ও রোমেলু লুকাকুদের মতো বড় তারকাদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর আছে।
কৌশলগতভাবে তিনি সবসময় সেরা কোচদের কাতারে না থাকলেও খেলোয়াড়দের মানসিকতা ও ইগো সামলানোর দক্ষতার জন্য পরিচিত।
৪০ ছুঁইছুঁই রোনালদো আর আগের মতো ক্ষিপ্র নন। পুরো ম্যাচ খেলার সামর্থ্যও আগের মতো নেই। তবে তাঁর অভিজ্ঞতা এখনো দলের বড় সম্পদ।
এই পর্তুগাল দলে একাই ম্যাচ বের করে আনার মতো একাধিক খেলোয়াড় আছেন। কিন্তু ড্রেসিংরুমে এমন একজন দরকার, যাকে ঘিরে দল একসঙ্গে লড়বে। সেই জায়গায় রোনালদো এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রতিভাবান দল কম ছিল না পর্তুগালের। কিন্তু প্রতিবারই কোথাও না কোথাও ছন্দপতন হয়েছে।
তবে এবার দলটির গভীরতা, অভিজ্ঞতা ও তরুণ শক্তির মিশ্রণ আলাদা আশাবাদ তৈরি করছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত তারকাখ্যাতিকে পেছনে রেখে যদি দল হিসেবে খেলতে পারে, তাহলে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হবে পর্তুগাল।
আর যদি শেষ পর্যন্ত ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর হাতে বিশ্বকাপ ওঠে, তাহলে সেটি শুধু একটি ট্রফি জয় হবে না; ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়েরও পূর্ণতা হবে।