বিজয় মজুমদার
আমি হতে পারতাম ‘নির্মল’। হয়ে গেলাম ‘সেইন্ট’। এই দুটি আমার স্কুলের নাম। আমার প্রথম স্কুলের নাম ছিল নির্মল শিশু বিদ্যালয়। কিন্তু সেখানে আমার পাঠ মাত্র দুদিন। তৃতীয় দিন বড় ভাইয়ের সুপরামর্শে দুই ভাই মিলে স্কুল পালানো। এরপর ধরা। তারপর নির্মলের তালিকা থেকে নাম কাটা।
এরপর ভর্তি হলাম দিনাজপুরের সেন্ট জোসেফ স্কুল-এ। সে সময় দিনাজপুরের অনেক ছেলেমেয়েই হয় ‘নির্মল’ হতো, নয়তো ‘সেইন্ট’। ছোটদের জন্য এই দুটি স্কুলই ছিল বেশ প্রসিদ্ধ।
১৯৭৮ সালে নির্মল স্কুল ঘোষণা দিল, আমি মোটেও নির্মল নই। এরপর মা আমাকে ‘সেইন্ট’ হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলেন। সেই সূত্রে সেইন্ট জোসেফ স্কুলের বেবি ক্লাসে ভর্তি হলাম। আর আবিষ্কার করলাম আতঙ্কিত শিশুদের এক জগৎ।
তখন মনে হতো, সেইন্ট হওয়ার কোনো ইচ্ছাই যেন এই শিশুদের নেই। স্কুলের গেটে কান্নার সুর। কাঁদতে কাঁদতে স্কুলে ঢোকা একটি শিশু অন্যদেরও কাঁদিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
তবে সেইন্টের মিস কিংবা সিস্টাররা শিশুদের কান্নাকে মোটেও পাত্তা দিতেন না। উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে শিশুদের হাতে ধরিয়ে দিতেন ছোট্ট গোলাকৃতির এক ধরনের ক্যান্ডি। শিশুরা যাকে বলত ‘টিকটিকির ডিম’। কান্না সেখানেই শেষ।
তবে কান্না এক ধরনের ছোঁয়াচে সমস্যা। যদি একজন কান্নাটাকে স্কুলের গেট থেকে ক্লাস পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারত, তাহলে তা গোটা ক্লাসে ছড়িয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করত। তখন টিকটিকির ডিমের বোয়াম হাতে সাদা পোশাকে হাজির হতেন একজন। তাঁর পরিচয়—তিনি ‘বড় সিস্টার’।
আমাদের সময়, এমনকি এখনো, স্কুলের মূল প্রবেশপথ—দক্ষিণ দিকের গেট দিয়ে ঢুকলে প্রথমে একটি কক্ষ পড়ত। তার পূর্ব পাশে ছিল একটি দরজা। সেই দরজা পেরোলেই যেন শুরু হতো ‘সেইন্ট জোসেফ রাজ্য’।
প্রবেশের পর প্রথম কক্ষের পাশের একটি রুম ছিল বেবি শাখার ক্লাসরুম। কক্ষের মাঝখানে শিক্ষকের চেয়ার-টেবিল, বাম পাশে একটি অ্যাবাকাস। দক্ষিণ দেওয়ালে কাঠের ফ্রেমে টাঙানো ছিল যীশু ও মাতা মেরির ছবি।
এই ক্লাসরুমের উত্তরে ছিল আরেকটি কক্ষ, যা বেবি ক্লাসের চেয়ে কিছুটা উঁচুতে। তার পূর্ব পাশের সংলগ্ন রুমটিই ছিল বড় সিস্টারের কক্ষ। স্কুলের প্রবেশপথ থেকে তাঁর কক্ষ পর্যন্ত ছিল একটি উঁচু বারান্দা। সেই বারান্দা দিয়েই যেতে হতো তাঁর কাছে।
সে সময় দিনাজপুর সেইন্ট জোসেফ স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী ছিলেন এই বড় সিস্টার। তখন স্কুলটিতে পড়ানো হতো প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত। অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণির পর সেখান থেকে বিদায় নিতে হতো সবাইকে।
স্কুলটি তখনও সহশিক্ষা পদ্ধতিতে পরিচালিত হতো, এখনো হয়। ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়লেও আমাদের সময় বসত আলাদা আলাদা।
আমাদের সময়ে সেইন্ট জোসেফের ঘণ্টা বাজানোর দায়িত্বও ছিল বড় সিস্টারের হাতে। তাঁর হাতে থাকত একটি ছোট পিতলের ঘণ্টা। ঘণ্টার হাতলের ওপরে খোদাই করা ছিল মানুষের হাতের আকৃতি। হাত নাড়িয়ে ঘণ্টা বাজাতে হতো। ঘণ্টা ছোট হলেও তার আওয়াজ ছিল বড় সিস্টারের কণ্ঠের মতোই—দৃঢ়, শক্তিশালী ও জোরালো।
একবার আমার বাবা স্কুল ছুটির আগেই আমাকে নিতে গিয়েছিলেন। স্কুল ছুটি হতো দুপুর ১২টায়। তখনো পাঁচ মিনিট বাকি। বাবা ক্লাস টিচারকে অনুরোধ করলেন আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
আমরা স্কুল থেকে বের হওয়ার উদ্যোগ নিতেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা বড় সিস্টার আটকালেন।
—“কেন ছাত্রটিকে নিয়ে যাচ্ছেন?”
বাবা বললেন, “আমি ওর বাবা। বাসায় নিয়ে যাচ্ছি।”
তিনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখনো পাঁচ মিনিট বাকি আছে। তুমি ক্লাসে যাও। আর আপনি দয়া করে ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করুন।”
বাবা এতে বিন্দুমাত্র আহত হননি। বরং তিনি বলতেন, একজন শিক্ষকের সময়নিষ্ঠার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো উচিত। কারণ একজন ছাত্রের পাঁচ মিনিটের শিক্ষাও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
আপাত গম্ভীর এই মানুষটির ভেতরেও যে একজন রসিক মানুষ বাস করতেন, তা টের পেয়েছিলাম ছোটবেলাতেই।
বার্ষিক পরীক্ষার পর নতুন ক্লাস শুরু হওয়ার সময় স্কুলে একটি অনুষ্ঠান হতো—লটারি। ইতালি থেকে উপহার হিসেবে আসা বিভিন্ন সামগ্রী ছিল এর আকর্ষণ। যেমন খেলনা, পুতুল, রঙিন বোতল ইত্যাদি।
লটারির মূল্য ছিল এক টাকা। একটি ঝুড়ি থেকে কাগজ তুলতে হতো। যে নম্বর উঠত, সেই নম্বরের জিনিস মিলত পুরস্কার হিসেবে।
আমার জীবনে এই লটারি একবারই পেয়েছিলাম। আর সেবার আমার ভাগ্যে উঠেছিল একটি প্রজাপতি। সত্যিকারের নয়, কাচের তৈরি একটি প্রজাপতি—আসলে সেটি ছিল একটি সেফটি পিন।
বড় সিস্টার সেটি দেখে বলেছিলেন, “সাবধানে ধরে রাখবে, না হলে উড়ে যাবে কিন্তু।”
বেবি ক্লাসে উঠেই আমরা মুখোমুখি হলাম একদল প্রবল প্রতিপক্ষের। যাদের প্রধান খেলা ছিল অন্যদের ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে মুখে কয়েকটি সাবধান চিহ্ন বসিয়ে দেওয়া। সেই দলের নেতা এখন আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধুদের একজন। তাই তাঁর নাম উল্লেখ করলাম না।
অক্ষশক্তির হামলায় সহজেই পরাস্ত হওয়ার পর আমাদেরও একটি ঐক্যজোট গঠন করতে হলো। আমাদের নেতা ছিল শাহানুর, ওরফে ‘বিলাই চোখ শাহানুর’। অসম্ভব ফর্সা এই ছেলেটির চোখ ছিল বেড়ালের মতো। দলের দ্বিতীয় সদস্য জুয়েল। আর দলের মার খাওয়ার জন্য নির্ধারিত সদস্যের নাম—বিজয়।
যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফল অসমাপ্তই থেকে গেল। কারণ বড় সিস্টার।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আগেই দুই পক্ষ শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হলো তাঁর মধ্যস্থতায়।
একদিন দুই পক্ষ মারামারিতে সুবিধা করতে না পেরে হাজির হল বড় সিস্টারের কক্ষে। তিনি কাউকে শাস্তি দিলেন না। শুধু বললেন, “বন্ধুরা যদি নিজেরা মারামারি করে, তাহলে গড দুজনকেই পানিশ করে।”
শুধু তা-ই নয়, তিনি আরও জানালেন—জাতিসংঘের থুড়ি, বড় সিস্টারের উদ্যোগে দুই পক্ষের মধ্যে যে অলিখিত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা ভঙ্গ করলে বিষয়টি শুধু গডের হাতে থাকবে না; তিনি নিজেও বড় স্কেল দিয়ে হাতে বাড়ি মেরে শান্তিচুক্তি ভঙ্গের মজা টের পাইয়ে দেবেন।
তাঁর দায়িত্বশীলতার একটি নমুনাও আমি পেয়েছিলাম।
বেবি থেকে ওয়ানে ওঠার সময় ভালো ফল করেছিলাম। খুশিতে দিনাজপুর ফায়ার সার্ভিসের সামনে একটি পত্রিকা ও বইয়ের দোকানে গিয়ে দাঁড়ালাম। উদ্দেশ্য—‘শিশু’ পত্রিকা কেনা।
দোকানদারকে গিয়ে বললাম, “শিশু আছে?”
তিনি মিষ্টি হেসে বললেন, “তুমি তো নিজেই শিশু। এই নাও শিশু পত্রিকা। দাম এক টাকা। তুমি সেইন্ট জোসেফে পড়? দেখি তোমার রেজাল্ট। বাহ! ভালো রেজাল্ট করেছ।”
তিনি পত্রিকা আর রেজাল্ট কার্ড ফেরত দিয়ে অন্য ক্রেতার দিকে মনোযোগ দিলেন।
আমি শিশু পত্রিকা হাতে নিয়ে খানিকটা এগিয়ে দিনাজপুর ইনস্টিটিউট পর্যন্ত গেছি, এমন সময় খেয়াল হলো—রেজাল্ট কার্ড তো হাতে নেই!
দৌড়ে দোকানে ফিরে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার রেজাল্ট কার্ডটা কি এখানে রেখে গেছি?”
তিনি বললেন, “হ্যাঁ বাবা, তুমি রেখে গিয়েছিলে। আমি সেটা তোমার স্কুলে দিয়ে এসেছি।”
এরপর তিনি আমাকে নিয়ে বের হতে যাবেন, এমন সময় দোকানে নতুন ক্রেতা এলেন। আমি বললাম, “আমি নিজেই যাচ্ছি।”
স্কুলে গিয়ে মিসকে বলতেই তিনি জানালেন, “তোমার রেজাল্ট বড় সিস্টারের কাছে।”
আমি গেলাম তাঁর কাছে।
তিনি বললেন, “উহু, তোমাকে আর রেজাল্ট দেব না। কারণ তুমি একবার হারিয়ে ফেলেছ। এবার রেজাল্ট দেব তোমার অভিভাবকের হাতে।”
ঠিক তখনই উদ্ধারকর্তা হয়ে এলেন লিরা আন্টি—আমার পড়াতুতো খালা। তাঁর আপন ও চাচাতো ভাই আমার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ত।
বড় সিস্টার বললেন, “আমি বুঝতে পারছি, আপনি তাঁর আসল অভিভাবক নন। কিন্তু এই শিশুটি তার রেজাল্ট হারিয়ে ফেলেছিল। তাই এবার আপনার হাতে রেজাল্ট তুলে দিচ্ছি। আশা করি, আপনি এটি ঠিকমতো তাঁর অভিভাবকের কাছে পৌঁছে দেবেন।”
মজার বিষয় হচ্ছে, বেবি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ফাইনাল পরীক্ষার একটিমাত্র রেজাল্ট এখনো আমার সংরক্ষণে আছে। আর সেটি হলো এই প্রায় হারিয়ে যাওয়া রেজাল্ট।
আর সেই চমৎকার দোকানের চেয়েও চমৎকার মানুষটির নাম ছিল কাজী বোরহান স্যার।
১৯৮১ সালে আমি দিনাজপুর জেলা স্কুল-এ ভর্তি হই। সেইন্ট জোসেফ স্কুলে শেষবার গিয়েছিলাম ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিতে।
সেজ মামার হাত ধরে বড় সিস্টারের কক্ষে যেতেই তিনি মামাকে বললেন, “আমাদের ছেলেদের আপনারা অন্য স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন, এটাই আমার কষ্ট। বিদায় হে আমার ছাত্র। ভালো মানুষ হও।”
বড় সিস্টারের আসল নাম ছিল সিস্টার থিওনেলা আরাকাথারাম্বিল। আমি যে বছর সেইন্ট জোসেফ স্কুল ছাড়ি, তার দুই বছর পর তিনিও স্কুলটি থেকে বিদায় নেন। আর ২০২০ সালের ১৯শে মে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।
ওপারে ভালো থাকবেন, বড় সিস্টার।