নিয়তি কেড়েছে দৃষ্টি, তবুও অপরাজেয় জাকির হোসেন

টাঙ্গাইলের কোদালিয়া গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান মোঃ জাকির হোসেন। বাবা লুৎফর রহমান, মা রিজিয়া বেগম। ছোটবেলা থেকেই অন্যদের মতো ছিলেন না তিনি। গ্রামের মাঠে-ঘাটে, স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, আবৃত্তি, নাটক আর গানের ভেতরেই যেন খুঁজে পেতেন নিজের অস্তিত্ব। শিল্প ছিল তার শ্বাস, মঞ্চ ছিল তার পৃথিবী।

১৯৯৪ সালে সাদত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর সামনে ছিল নিরাপদ জীবনের অনেক পথ। কিন্তু জাকির হোসেন বেছে নিয়েছিলেন ভিন্ন এক জীবন—সংস্কৃতির জীবন,  সৃষ্টিশীল মানুষের জীবন।

১৯৯৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সংকেত নাট্যদল’। সেই ছোট্ট স্বপ্নের দলটি আজ টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক পরিচিত নাম। গত ৩০ বছর ধরে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। নাট্যকার হিসেবে লিখেছেন ২২টি নাটক, যার ১৩টি মঞ্চস্থ হয়েছে। টাঙ্গাইলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে তার গবেষণামূলক গীতিনৃত্যনাট্য ‘আবহমান টাঙ্গাইল’ শুধু স্থানীয়ভাবে নয়, দেশের বাইরেও প্রশংসা কুড়িয়েছে।

স্বপ্ন বড় হলে মানুষ গ্রাম ছাড়ে। জাকির হোসেনও জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমান ঢাকায়। সেখানে মিডিয়া জগতে দ্রুতই নিজের জায়গা তৈরি করেন। টিভির প্রযোজক, ডিরেক্টর গিল্ডস ও অভিনয় শিল্পী সংঘের সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি হয়ে ওঠেন এক পরিচিত মুখ। বিজ্ঞাপনের চাকচিক্যময় দুনিয়ায়, নাটকের আলো-ছায়ায়, শুটিং সেটের ব্যস্ততায়—জাকির হোসেন তখন ছিলেন এক নির্ভরতার নাম।

কিন্তু নিয়তি কখন কার জীবনের চিত্রনাট্য বদলে দেয়, কেউ জানে না।

২০১৩ সালের ৩রা জানুয়ারি। হঠাৎ স্ট্রোক। দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ তার শরীরকে ভেতর থেকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল। একসময় চোখের রক্তনালী শুকিয়ে যেতে শুরু করে। তারপর একদিন—চিরতরে নিভে যায় দুই চোখের আলো।

যে মানুষটি একসময় ক্যামেরার ফ্রেমে অন্যদের আলো ঠিক করে দিতেন, তিনি নিজেই ডুবে গেলেন এক অন্তহীন অন্ধকারে।

চিকিৎসার পেছনে শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে ফেলেন তিনি। একসময় যিনি মঞ্চ মাতিয়েছেন, মানুষের করতালিতে ভেসেছেন, সেই মানুষটিকেই তখন জীবনযুদ্ধ করতে হয়েছে নিঃশব্দে, নিঃসঙ্গভাবে।

কিন্তু এখানেই জাকির হোসেনের গল্প অন্যদের থেকে আলাদা।

অনেকেই অন্ধকারে হারিয়ে যায়। তিনি হারাননি। কারণ তার চোখের আলো নিভে গেলেও, অন্তরের আলো নিভেনি।

নিজের কষ্ট তাকে শিখিয়েছে অসহায় মানুষের ব্যথা বুঝতে। নিজের অন্ধকার তাকে পৌঁছে দিয়েছে সমাজের সেইসব মানুষের কাছে, যাদের দিকে কেউ ফিরে তাকায় না।

সেই অনুভব থেকেই তিনি গড়ে তুলেছেন ‘অক্ষম ও অসহায় পুনর্বাসন সংস্থা’।

আজ এই দৃষ্টিহীন মানুষটি নিজে দেখতে পান না, কিন্তু অসংখ্য অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কারো ঘরে খাবার পৌঁছে দেন, কারো চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন, কারো সন্তানকে স্কুলে পাঠান, আবার কারো মাথার ওপর ছায়া হয়ে দাঁড়ান।

ভাবুন একবার—যে মানুষটি নিজের চলার পথও চোখে দেখতে পান না, সেই মানুষটিই অন্যদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

কিন্তু এই মানবিক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া তার জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। নাটক লেখা, নির্দেশনা, অভিনয় আর মানুষের সামান্য সহযোগিতায় এতদিন কাজ চালালেও এখন সেই পথ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

তবুও তিনি থামেননি।

কারণ জাকির হোসেন করুণা চান না। তিনি চান মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াক।

তার নিজের ভাষায়—

“আমি চোখে দেখি না সত্য, কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের কষ্ট আমার কলিজায় লাগে। আমি একা হয়তো বেশিদূর যেতে পারব না, কিন্তু সমাজের সামর্থ্যবান মানুষগুলো যদি পাশে দাঁড়ান, তবে এই অসহায় পরিবারগুলো অন্তত না খেয়ে মরবে না।”

এই মানুষটি কোনো করুণা চান না। তিনি চান অংশীদারিত্ব। চান মানবতার হাত।

আপনার একদিনের অপ্রয়োজনীয় খরচ হয়তো কোনো একটি পরিবারের এক মাসের খাবারের নিশ্চয়তা হতে পারে। আপনার সামান্য সহযোগিতা হয়তো কোনো অসহায় শিশুর মুখে হাসি ফিরিয়ে দিতে পারে।

আজ জাকির হোসেনের চোখে আলো নেই, কিন্তু তিনি এখনো অন্যদের জীবনে আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছেন।

আমরা কি পারি না তার এই আলোর যাত্রায় পাশে দাঁড়াতে?

আসুন, দৃষ্টিহীন এই মানুষটির হাতকে শক্তিশালী করি। তার মানবিক লড়াইকে থেমে যেতে না দিই। কারণ পৃথিবী এখনো বেঁচে আছে জাকির হোসেনদের মতো মানুষদের জন্যই।

মানুষ একদিন চলে যায়, কিন্তু অপর মানুষের জন্য করা তার কাজগুলোই বেঁচে থাকে অনন্তকাল।

সহযোগিতা পাঠাতে বা বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুন :

 

জাকির হোসেন

01712 867386

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *