গাজা যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অফ পিস’ উদ্যোগ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত এই প্ল্যাটফর্মে ১০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ।
মিডল ইস্ট আই–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অর্থ গাজায় নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনী গঠনের প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহার করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল মানবিক বা নিরাপত্তা সহায়তা নয়; বরং যুদ্ধোত্তর গাজায় ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও একটি বড় কৌশলগত পদক্ষেপ।
ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগে গঠিত ‘বোর্ড অফ পিস’কে গাজার যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিকল্প আন্তর্জাতিক কাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতে জাতিসংঘের প্রভাবকে পাশ কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক জোট গঠনের প্রচেষ্টা।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বোর্ডটির প্রথম শীর্ষ সম্মেলনে ১৯টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। পাশাপাশি অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো আরও প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে বলে জানা গেছে।
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গাজায় প্রায় ২৭ হাজার সদস্যের একটি নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনী গঠন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বাহিনীটির সদস্যদের প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে জর্ডান ও মিশর।
শুধু পুলিশ নয়, গাজায় একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ উদ্যোগে ইন্দোনেশিয়া প্রায় ৮ হাজার সৈন্য পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া মরক্কো, কাজাখস্তান, কসোভো এবং আলবেনিয়া–সহ আরও কয়েকটি দেশ অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে আরব আমিরাত। ইয়েমেন, লিবিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা রয়েছে। এখন গাজার পুনর্গঠনে সরাসরি অর্থায়নের মাধ্যমে আমিরাত নতুন করে আঞ্চলিক নেতৃত্বের অবস্থান জোরদার করতে চাইছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
এর আগে মিশর ও জর্ডান নিরাপত্তা প্রশিক্ষণে সহযোগিতার ইঙ্গিত দিলেও, এত বড় অঙ্কের সরাসরি অর্থায়ন এবারই প্রথম।
তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে প্রশ্নও কম নয়। গাজার বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে নতুন নিরাপত্তা বাহিনী কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলের একাংশে।
বিশেষ করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতিনির্ধারক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা সদস্যদের একটি অংশ ভবিষ্যতে ইসরায়েলবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়া সম্প্রতি মার্কিন-ইসরায়েলি ইরান হামলার প্রেক্ষাপটে ‘বোর্ড অফ পিস’-এর সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বলে খবর প্রকাশ হয়েছে। এতে পুরো উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গাজার পুনর্গঠন কেবল অর্থ বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয় নয়; এটি জড়িত দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাত, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির সঙ্গে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—গাজা যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে।