সম্প্রতি শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ একটি স্কুলের টয়লেট ভিজিট করলেন।
ভিজিট শেষে তিনি নাকি সারারাত ঘুমাতে পারেননি।
বিষয়টা খুবই এপ্রিশিয়েটেড। মন্ত্রী স্কুলের বাস্তব অবস্থা নিজে গিয়ে দেখছেন, মাঠপর্যায়ে নেমে সমস্যা বুঝতে চাইছেন। এটা একটা পজিটিভ সিগন্যাল।
কিন্তু একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে।
প্রাথমিক শিক্ষার সাথে যুক্ত যেসকল কর্মকর্তা আছেন—যাদের প্রতি মাসে সুনির্দিষ্ট সংখ্যক স্কুল ভিজিটের টার্গেট থাকে, যারা নিয়মিতভাবেই সেই টার্গেট পূরণ করেন—তারা কি করেন? তারা কি স্কুলের টয়লেট দেখে ঘুমাতে পারেন না?
নাকি তারা বেশ আরামেই ঘুমান?
দীর্ঘদিন প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে একজন এনজিও কর্মকর্তা খুব কাছে থেকে এই কর্মকর্তাদের কাজের ধরন দেখেছেন। প্রতিটি থানায় একজন শিক্ষা কর্মকর্তা এবং একাধিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আছেন। তাদের কাজ হলো স্কুলের সামগ্রিক কাজকর্ম দেখভাল করা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—তাদের এটা কি স্কুল ভিজিট, নাকি প্রমোদ ভ্রমণ, তা বুঝা মুশকিল।
ওই কর্মকর্তার একবার আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে স্কুল ভিজিটের অভিজ্ঞতা হয়েছিল।
সেটা মামুলি কোনো স্কুল ভিজিট ছিল না। মনে হয়েছিল, আমরা বুঝি কোনো বরযাত্রায় অংশ নিচ্ছি।
আগে থেকেই স্কুল কর্তৃপক্ষ সব কিছু ঠিক করে রেখেছে। শিক্ষা কর্মকর্তা গাড়ি নিয়ে কোথায় এসে নামবেন, কোন শিক্ষক তাকে রিসিভ করে স্কুলে নিয়ে আসবেন—সব প্ল্যান করা।
স্কুলটা স্থলভাগ থেকে একটু দূরে। সরাসরি গাড়ির রাস্তা নেই। শিক্ষা কর্মকর্তা মহোদয়কে একটা সাকো পার হতে হবে।
এই কষ্ট যাতে না করতে হয়, সেইজন্য স্কুলের হেডমাস্টার সুদৃশ্য সামিয়ানা টানানো বিশাল ট্রলার ভাড়া করে রেখেছেন।
স্কুলে গিয়ে তাদের আয়োজন দেখে ওই এনজিও কর্মকর্তা নিশ্চিত হয়েছেন—তিনি সত্যিই একটা বরযাত্রায় অংশ নিয়েছেন।
বিয়ে বাড়ির মতো প্যান্ডেল টানানো। বাবুর্চি ভাড়া করা। রান্নাবান্না চলছে। প্রায় ২০-৩০ পদের কম হবে না আইটেম।
খাবার টেবিলে হেডমাস্টার খাবারের বিশদ বর্ণনা দিচ্ছেন—কোনটা কোন পদ, খেতে কেমন, কোথা থেকে এই ছোট মাছ সংগ্রহ করেছেন, কতটা কষ্ট করে এই তাজা মাছ আনা হয়েছে।
সাথে অন্যান্য শিক্ষকদের সম্মতি আদায় করার চেষ্টা করছেন যে, এই কষ্টকর অভিযানে অন্য শিক্ষকরাও ভূমিকা রেখেছেন।
অমুক আপা বা অমুক স্যার স্কুল ভিজিট করবেন, এই খবরে স্কুলের শিক্ষকরা তাকে খুশি রাখার জন্য এতই ব্যস্ত থাকেন যে, সেখানে শিক্ষার উন্নয়ন বা স্কুলের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনার সুযোগ কমই থাকে।
স্যার বা আপা কী খেতে পছন্দ করেন, কোন ধরনের গিফট দিলে তিনি খুশি হবেন—সেগুলো নিয়েই চলে বিস্তর গবেষণা।
অবশ্য এমনও শোনা গেছে, কোনো কোনো স্যার বা আপা গিফটের পরিবর্তে টাকা নিতেই পছন্দ করেন।
ভিজিটের দিন মোটামুটি সবাই ব্যস্ত থাকেন স্যার বা আপাকে খুশি করার জন্য। আর ভিজিটরত স্যার/আপারাও খুশিতে গদগদ হয়ে ভিজিট সমাপ্ত করেন।
খুব কম সময়ই তাদের স্কুল ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। ক্লাস দেখার সুযোগ হয়।
এর মধ্যে যে ব্যতিক্রম নেই তা বলছি না। কিছু কিছু কর্মকর্তা হয়তো তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবেই পালন করছেন।
কিন্তু মূল সমস্যা হলো—ভিজিটের আউটকাম নিয়ে পর্যালোচনা হয় বলে মনে হয় না। কারণ এর রিফ্লেকশন পরের ভিজিটে দেখা যায় না।
মাসের পর মাস, বছরের পর বছর একই কায়দায় ভিজিট চলতে থাকে। স্কুলের উন্নয়ন অধরাই থেকে যায়।
এবার কথা বলি সেই হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জের কথা, যেখানে ভিজিটের আয়োজন তো দূরের কথা, সেখানে স্কুলে পৌঁছানোটাই একটা দুঃসাহসিক অভিযান।
যখনই সুনামগঞ্জে কোনো অফিসিয়াল সফরে যায়, বাংলাদেশের চিরচেনা সেই রিচুয়ালটাই ফলো করা হয়।
কর্মকর্তাদের নেওয়া হয় কয়েকটি সিলেক্টেড স্কুলে। দেখা করানো হয় প্রিপেয়ার্ড অফিসিয়ালদের। আপনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ক্লাসরুম দেখেন, মঞ্চ সাজানো প্রোগ্রাম উপভোগ করেন এবং সামনে আনা হয় সিলেক্ট করা কিছু মেধাবী শিক্ষার্থীকে।
সবকিছুই খুব সুন্দর লাগবে। খুব গোছানো।
কিন্তু এটা সুনামগঞ্জ নয়। এটা সুনামগঞ্জের একটা ‘পলিশড’ ইলিউশন।
যাদের বাড়ি এই জেলায়, যারা প্রতিদিন তাদের সন্তানদের এই মাটিতেই স্কুলে পাঠায়, তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা সুনামগঞ্জকে চেনে।
সুনামগঞ্জের জনসংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। এর মধ্যে ৬ লাখ ১৪ হাজারের বেশি মানুষের বয়স ১০ বছরের নিচে।
জেলার ৮৫ শতাংশের বেশি মানুষ বাস করেন গ্রামীণ এলাকায়। ঠিকঠাক রাস্তা নেই, যাতায়াতের কোনো সুব্যবস্থা নেই।
ফলে এই ৬ লাখ শিশুর স্কুলে যাওয়াটা কোনো সাধারণ রুটিন নয়। নৌকায় করে নদী পার হওয়া, পানিতে ডুবে যাওয়া কাদাপথ পাড়ি দেওয়া, অথবা ধানক্ষেতের সরু আইল ধরে হেঁটে স্কুলে যাওয়া।
অফিসিয়াল ডেটা বলছে, সুনামগঞ্জে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ২,১০০টি প্রাইমারি ইনস্টিটিউশন, ১০,০০০ শিক্ষক এবং ৩ লাখ ১৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী আছে।
কিন্তু ১,৪৭৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশিরভাগেই যথেষ্ট শিক্ষক নেই। প্রায় ১,০০০টির বেশি স্কুলে শিক্ষকের সংকট।
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার ‘দক্ষিণ আমজোড়া নুরুন্নাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। স্কুলটিতে ৬টি গ্রেডে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু শিক্ষক আছেন মাত্র ১ জন। গত তিন বছর ধরে একজন মানুষ একাই এই পুরো স্কুলটা চালাচ্ছেন।
এর সরাসরি ফলাফল? সুনামগঞ্জের প্রাইমারি ড্রপআউট রেট ২১.২৪%, যেখানে জাতীয় হার ১৩.১৫%।
প্রাইমারি সারভাইভাল রেট মাত্র ৭৮.৭৮%। অর্থাৎ, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে একজন শিশু প্রাথমিক স্কুল থেকেই ঝরে পড়ছে।
সেকেন্ডারি লেভেলে সুনামগঞ্জে ১ লাখ ৩৯ হাজার ১৫ জন স্টুডেন্টের বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র ২,৬৪৯ জন।
জেলার ২৭৭টি সেকেন্ডারি ইনস্টিটিউশনের মধ্যে ২৩৮টিই প্রাইভেট। পাবলিক ইনস্টিটিউশন হিসেবে তালিকাভুক্ত আছে মাত্র ১৪টি!
যে জেলায় ১০ বছরের নিচে শিশুর সংখ্যা ৬ লাখের বেশি, সেই বিশাল, দরিদ্র এবং জিওগ্রাফিক্যালি ডিফিকাল্ট জেলার জন্য সরকারি হাইস্কুল মাত্র ১৪টি!
কলেজ লেভেলে ৫৫ হাজার ২৯৭ জন কলেজ স্টুডেন্টের বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র ৭৬৬ জন। পুরো জেলায় মাস্টার্স লেভেলের কলেজ মাত্র একটি।
২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় সুনামগঞ্জের পাসের হার ছিল ৪৫.৮০%। জাতীয় পাস রেট ছিল ৫৮.৮৩%।
এত অফিসিয়াল ডেটা দেখার পরও মাঠপর্যায়ে যারা কাজ করেন, তাদের বিশ্বাস হয় না যে ড্যামেজ আসলে এতটুকুই।
কারণ এটা হলো বছরের পর বছর ধরে নেগলেক্টেড একটা এডুকেশন কালচারের রেজাল্ট।
সত্যিকার অর্থে যদি আমরা স্কুলের উন্নয়ন চাই, তাহলে প্রথমেই যেটা করা দরকার তা হলো—স্কুল পর্যায়ে যেসব কর্মকর্তা সরাসরি স্কুল তদারকির কাজে যুক্ত, তাদেরকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে।
তাদের প্রত্যেক ভিজিটের একটা সুনির্দিষ্ট টার্গেট এবং আউটকাম সেট করে দিতে হবে। এবং তারা যাদের কাছে রিপোর্টেবল, তাদেরও জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে।
এই কাজটা যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে মন্ত্রী মহোদয়ের মতো আর কাউকে স্কুলের টয়লেট ভিজিট করে নিদ্রাহীনতায় রাত কাটাতে হবে না।
দ্বিতীয়ত, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টা শুধুমাত্র শিক্ষা কারিকুলামের একটা চ্যাপ্টারের মধ্যে আবদ্ধ রাখলেই হবে না। এর প্রায়োগিক দিকে নজর দিতে হবে।
সপ্তাহের একটা নির্দিষ্ট দিন এক একটা ক্লাসের জন্য ‘স্কুল ক্লিন ডে’ ঘোষণা করা যেতে পারে। সেদিন তারা স্কুলের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক যাবতীয় বিষয় নিয়ে কাজ করবে। এর সাথে অবশ্যই পাঠদান চলতে থাকবে।
এটা একটা কালচারে পরিণত করতে পারলে, এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী হবে।
শিশুরা যখন এই প্র্যাক্টিসের সাথে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, তখন মোটামুটি দুইটা ঘটনা ঘটতে পারে।
এক, সামাজিকভাবে একটা জেনারেশন গড়ে উঠবে যারা ভাবতে থাকবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শুধু সুইপারের দায়িত্ব নয়, এটা আমাদের সবার দায়িত্ব।
দুই, পেশা হিসেবে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ওপর থেকে একটা নেগেটিভ ধারণা পাল্টাতে থাকবে।
পৃথিবীর বহু দেশের স্কুলে এই পরিচ্ছন্নতার বিষয় সিরিয়াসলি শেখানো হয় হাতে-কলমে। নিয়ম করে স্কুলের শিক্ষার্থীরা স্কুলের আশেপাশের রাস্তা বা পার্ক পরিষ্কার করে তাদের পাঠের অংশ হিসেবে।
একটা উদাহরণ দেই।
ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের একটা এলাকায় একজন শিক্ষা কর্মকর্তা থাকেন। তার পাশেই একটা বিশাল পার্ক।
একদিন তিনি দেখলেন, শিশুদের একটা বড় টিম সেই পার্ক পরিষ্কার করছে। খুবই আনন্দের সাথে করছে। রীতিমতো তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে—কে কার আগে গার্বেজ ব্যাগ ভরবে।
এই শিশুদের সবার বয়স ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে। পুরো টিমকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৪ জন শিক্ষক। তারাও পরিষ্কার করছেন, পাশাপাশি শিশুদের শেখাচ্ছেন।
ওই শিক্ষা কর্মকর্তার ছেলে এবং মেয়েও তাদের টিমে জয়েন করল। শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করে জানতে পারলেন, এটা একটা কমিউনিটি স্কুল। প্রায় অফ-ডে-তে তারা আশেপাশের পার্ক এবং রাস্তাঘাট পরিষ্কারের কাজে অংশ নেয় বিভিন্ন টিমে ভাগ হয়ে।
এখন একটু ভেবে দেখেন—যেই বয়স থেকে শিশুরা এই কাজের সাথে যুক্ত হচ্ছে, বড় হলে এটা কি তাদের মধ্যে একটা কালচারাল হ্যাবিটে পরিণত হবে না?
মন্ত্রী মহোদয় স্কুলের টয়লেট দেখে ঘুমাতে পারেননি। এটা ভালো লক্ষণ।
কিন্তু একজন মন্ত্রীর এক রাতের অনিদ্রা দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা সমাধান হবে না।
দরকার কাঠামোগত পরিবর্তন। দরকার জবাবদিহিতা। দরকার ভিজিটের আউটকাম মনিটরিং।
আর দরকার শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখানো—পরিচ্ছন্নতা শুধু সুইপারের কাজ নয়, এটা সবার দায়িত্ব।
বার্মিংহামের ওই ৫ বছরের শিশুটা যখন আনন্দের সাথে গার্বেজ ব্যাগ ভরছে, তখন সে শিখছে একটা জীবনব্যাপী পাঠ।
আমাদের সুনামগঞ্জের ওই ৬ লাখ শিশু কি কখনো সেই পাঠ শিখতে পারবে?
নাকি তারা শুধুই কাগজের ডেটা হয়ে থেকে যাবে?
মন্ত্রী মহোদয়ের নিদ্রাহীন রাতের উত্তর খুঁজতে হলে, আমাদের সিস্টেমকেও নিদ্রাহীন হতে হবে।
অন্তত স্কুল ভিজিটের নামে বরযাত্রা চালানো বন্ধ করে।