পানি মানুষের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদা। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে সেই পানির সরবরাহ ব্যবস্থাও এখন সাইবার হামলার লক্ষ্যবস্তু। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অঙ্গরাজ্যের পানি সরবরাহ অবকাঠামোতে সাম্প্রতিক সাইবার হামলা সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া এই হামলার পরিধি ক্রমেই বড় হয়েছে। তদন্তে এখন পর্যন্ত এমন তথ্য মিলেছে, যা ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের দিকে ইঙ্গিত করছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নাম ঘোষণা করেনি।
প্রথমে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে ৩০টির বেশি পৌর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক কার্যক্রম ধরা পড়ে। পরে এফবিআই, পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) এবং সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিরাপত্তা সংস্থা (সিআইএসএ) জানায়, অন্তত সাতটি অঙ্গরাজ্যে একই ধরনের হামলার ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।
সরকারি সংস্থাগুলো সব অঙ্গরাজ্যের নাম প্রকাশ করেনি। তবে মিনেসোটা, মিশিগান ও উইসকনসিনে হামলার ঘটনা নিশ্চিত করা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।
হ্যাকারদের মূল লক্ষ্য ছিল প্রোগ্রামেবল লজিক কন্ট্রোলার (পিএলসি)। এই ডিভাইসগুলো দূর থেকে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার পাম্প, ভালভ ও চাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
তদন্তে দেখা গেছে, ইন্টারনেটে উন্মুক্ত অবস্থায় থাকা এসব কন্ট্রোলারে অনুপ্রবেশ করে হ্যাকাররা পাসওয়ার্ড ও আইপি কনফিগারেশন পরিবর্তন করে দেয়। ফলে স্থানীয় অপারেটররা নিজস্ব সিস্টেম থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
কিছু এলাকায় স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পানি সরবরাহ চালু রাখতে হয়। কোথাও কোথাও পানির চাপ কমে যাওয়ায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো এলাকায় পানি দূষণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারী সংস্থাগুলোর মতে, হামলার কৌশল, লক্ষ্য নির্বাচন এবং ব্যবহৃত পদ্ধতির সঙ্গে অতীতে ইরান-সমর্থিত হ্যাকারদের কার্যক্রমের মিল রয়েছে।
এর আগেই ২২ জুলাই সিআইএসএ, এফবিআই এবং অন্যান্য ফেডারেল সংস্থা যৌথ সতর্কবার্তায় জানিয়েছিল, ইরান-সমর্থিত সাইবার গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে তৎপরতা বাড়িয়েছে।
তবে তদন্ত এখনো চলছে। এজন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো গোষ্ঠীকে দায়ী করা হয়নি।
ঘটনার পর বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নেয়।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম প্রতিক্রিয়ায় মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের প্রশাসনের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, হামলার জন্য রাজ্যের অদক্ষতাই দায়ী। একই সঙ্গে মন্তব্য করেন, ইরানের আরও বড় সমস্যা রয়েছে।
অন্যদিকে মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ বলেন, এটি আধুনিক যুদ্ধের একটি উদাহরণ। তাঁর দাবি, হামলা শুধু মিনেসোটায় নয়, আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে হয়েছে। তিনি ফেডারেল সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার অভিযোগও তোলেন।
হামলার পর বেশ কয়েকটি শহর দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা চালু করে।
প্লাইমাউথে দুটি ওয়াটার টাওয়ার ও একাধিক স্যুয়ার লিফট স্টেশন আক্রান্ত হলেও ম্যানুয়াল পরিচালনায় পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়।
দক্ষিণ সেন্ট পল ও ব্রাহামেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কোথাও দীর্ঘ সময় পানি সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়নি।
ঘটনার পর সিআইএসএ, এফবিআই ও ইপিএ যৌথভাবে নতুন নিরাপত্তা নির্দেশনা দিয়েছে।
তাদের সুপারিশগুলো হলো—
- ইন্টারনেটে উন্মুক্ত পিএলসি ও অন্যান্য অপারেশনাল প্রযুক্তি দ্রুত বিচ্ছিন্ন করা।
- শক্তিশালী ও নিয়মিত পরিবর্তিত পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা।
- ফায়ারওয়াল ও নিরাপদ গেটওয়ের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক সুরক্ষিত রাখা।
- অনুমোদিত ডিভাইসের মধ্যেই যোগাযোগ সীমাবদ্ধ রাখা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বহু বছর আগে স্থাপন করা হয়েছে। সেগুলো বর্তমান সাইবার হুমকি মাথায় রেখে নির্মিত হয়নি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাষ্ট্র-সমর্থিত সাইবার হামলায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন প্রচলিত যুদ্ধের পাশাপাশি সাইবার সংঘাতেরও কেন্দ্রবিন্দু।
২০২৩ সালেও ইরান-সংশ্লিষ্ট একটি হ্যাকার গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের অভিযোগ উঠেছিল। এবারও একই ধরনের দুর্বলতাকে কাজে লাগানো হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এবারের হামলায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা পানি দূষণের ঘটনা ঘটেনি। তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এটিকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন।
তাদের মতে, ভবিষ্যতের সাইবার হামলা আরও সমন্বিত ও বিধ্বংসী হতে পারে। তাই শুধু প্রযুক্তিগত প্রতিরক্ষা নয়, জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত সাইবার নিরাপত্তা কৌশল, অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং ফেডারেল-রাজ্য সমন্বয় জোরদার করাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।