৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ: চারা রোপণের পাশাপাশি টিকে থাকার হার নিশ্চিতের তাগিদ

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সভায় পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা।

বৃক্ষরোপণকে টেকসই সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, শুধু চারা রোপণের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। রোপণের পর চারার পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং টিকে থাকার হারও নিশ্চিত করতে হবে।

সোমবার (৭ই সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচির জাতীয় বৃক্ষরোপণ সেলের সহায়ক টাস্কফোর্সের তৃতীয় সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। এ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, সংস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

সভায় জানানো হয়, ২০২৬ সালে দেশে মোট ৫ কোটি ১৪ লাখ ৮৮ হাজার ৯৩০টি চারা রোপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নিজস্বভাবে উৎপাদিত চারা দিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৮২ লাখ এবং নিজস্ব অর্থায়নে সংগৃহীত চারা দিয়ে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ চারা রোপণ ও পরিচর্যার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা নিজ নিজ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ইতোমধ্যে চারা রোপণ করছে। এর বাইরে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এনজিও প্রায় ২৫ লাখ চারা রোপণ করেছে। স্থানভিত্তিক তথ্য পাওয়া গেলে এসব চারার তথ্য মূল ডাটাবেজে যুক্ত করা হবে।

সভায় আরও জানানো হয়, আগামী ডিসেম্বরে উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ প্রজাতির চারা রোপণ করা হবে। এর মাধ্যমে ২০২৬ সালের নির্ধারিত বৃক্ষরোপণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে স্থানীয় আবহাওয়া, মাটির গুণাগুণ এবং প্রতিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রজাতি বেছে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দেন।

নদী, খাল, বেড়িবাঁধ, সড়ক ও রেলপথের পাশের উপযোগী জমিতে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানোর পরামর্শও দেন তিনি। একই সঙ্গে রোপিত চারার সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো কারণে কোনো চারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত তা প্রতিস্থাপনের কথাও বলেন প্রতিমন্ত্রী।

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চারা রোপণের পরবর্তী পরিচর্যার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে সভায়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে রোপণের পরবর্তী চার বছরের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার পরিকল্পনা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় আকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সাফল্য শুধু কতটি চারা রোপণ করা হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং কতগুলো চারা শেষ পর্যন্ত গাছ হিসেবে টিকে থাকে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রোপণের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যা, সুরক্ষা ও তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) শামিমা বেগম উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, সেতু বিভাগ এবং বন অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন।

সভায় অধ্যাপক ড. মো. নূরুল ইসলাম, টেকনিক্যাল এক্সপার্ট মো. জামাইল বশীর জেবি, প্রকৌশলী শাহ আদনান মাহমুদসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য বাস্তবায়নে এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সুফল নিশ্চিত করতে রোপিত চারার পরিচর্যা, টিকে থাকার হার এবং স্থানভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণে জোর দেওয়ার বিষয়টি সভায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *