সমুদ্রসম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশে আবারও জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমি নিয়ে একটি বিশেষ ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (৭ই সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে সভাপতিত্ব করেন পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, এমপি। এতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ এবং পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম উপস্থিত ছিলেন।
ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরেন মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের প্রধান কমোডর শেখ মাহমুদুল হাসান (অব.)।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বঙ্গোপসাগরের একটি বিস্তৃত অংশজুড়ে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সামুদ্রিক এলাকা ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি। কোথাও কোথাও এর গভীরতা প্রায় ২ হাজার ২০০ মিটার পর্যন্ত। তবে এই বিশাল সামুদ্রিক সম্পদের তুলনামূলকভাবে অল্প অংশই বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ব্লু ইকোনমি বলতে সাধারণভাবে সমুদ্র ও সামুদ্রিক সম্পদের এমন ব্যবহারকে বোঝায়, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও সুরক্ষিত থাকবে।
বাংলাদেশের জন্য এই ধারণার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। কারণ দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার সঙ্গে সমুদ্রের সরাসরি ও পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
ব্রিফিংয়ে আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর একটি হলো সামুদ্রিক মৎস্য ও মেরিকালচার। বঙ্গোপসাগরে মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণিজ সম্পদের বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে অতিরিক্ত আহরণ, অবৈধ ট্রলিং এবং প্রজননক্ষম মাছ ও পোনা ধরার মতো কর্মকাণ্ড সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের ওপর চাপ তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছ ধরার ক্ষেত্রগুলোর একটি বড় অংশ অতিরিক্ত আহরণের ঝুঁকিতে রয়েছে।
সামুদ্রিক মাছের টেকসই ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মেরিকালচার বা সমুদ্রে নিয়ন্ত্রিতভাবে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ চাষ ভবিষ্যতে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও ব্লু ইকোনমির অন্যতম বড় সম্পদ। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দেশ হিসেবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের বন্দরগুলোর গুরুত্ব রয়েছে।
বন্দর অবকাঠামোর উন্নয়ন, আধুনিক নৌপরিবহন ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে এ খাত থেকে রাজস্ব ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক সংযোগ আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকও ব্লু ইকোনমির গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে টেকসই নৌপরিবহন ও বন্দর ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে আসছে।
সমুদ্র থেকে জ্বালানি আহরণও বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর একটি। বিশেষ করে অফশোর নবায়নযোগ্য জ্বালানি ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বজুড়ে ব্লু ইকোনমির আলোচনায় অফশোর উইন্ড এনার্জি এবং অন্যান্য সামুদ্রিক নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সমুদ্রভিত্তিক জ্বালানি সম্পদের সম্ভাবনা যাচাই ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপগুলো পর্যটনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সমুদ্রসৈকত, দ্বীপ, ম্যানগ্রোভ বন এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তোলা যেতে পারে।
তবে পর্যটন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন সামুদ্রিক দূষণ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাই ব্লু ইকোনমির ধারণায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সমুদ্রের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। সুন্দরবনসহ উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ, মাছের প্রজননক্ষেত্র এবং অন্যান্য সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষা ও জীবিকার উৎস।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, ম্যানগ্রোভ ও অন্যান্য উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ শুধু জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলাতেও গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো মাছের আবাসস্থল তৈরি করে এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশে ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, সমুদ্র অর্থনীতির বিভিন্ন খাত নিয়ে একাধিক মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থা কাজ করছে। ফলে কার্যকর সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সমুদ্রসম্পদের সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনায় তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, সামুদ্রিক গবেষণা, দক্ষ জনবল এবং বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামুদ্রিক পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় রাখতে হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই ব্রিফিংয়ে ব্লু ইকোনমির বিভিন্ন খাতকে একই কাঠামোর মধ্যে দেখার যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সমুদ্রনীতি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জন্য শুধু ভৌগোলিক সীমানা নয়। এটি খাদ্য, জ্বালানি, বাণিজ্য, পর্যটন ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। সেই সম্ভাবনাকে টেকসই অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হলে সমুদ্রের সম্পদ আহরণের পাশাপাশি সমুদ্রের স্বাস্থ্যও রক্ষা করতে হবে।