দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই মশাবাহিত এই রোগের সংক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৪২ হাজার ৫৯০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ১১৭ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায়ই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৫৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছে চারজনের—চলতি বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক ভর্তি।
পরিস্থিতি ক্রমেই দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা আরও ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ডেঙ্গুর রোগী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যার ওপর চাপও বেড়েছে। রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা ও গ্রামাঞ্চলেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল এন্টোমোলজিস্ট অধ্যাপক কবিরুল বাশারের মতে, এডিস মশার বিস্তারের কারণে এখন দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে।
ডেঙ্গুর পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ।
৩২ বছর বয়সী জাহিদ হাসানের চার বছরের ছেলে উচ্চ জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। শিশুটির অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিয়ে তিনটি সরকারি হাসপাতালে ছুটে যান জাহিদ। কিন্তু কোথাও একটি শয্যাও পাননি।
“আমি চরম ভয়ে ছিলাম। একজন বাবা হিসেবে নিজের সন্তানকে ক্রমশ অসুস্থ হতে দেখা এবং কোথায় ভর্তি করাতে পারব তা না জানা ছিল অসহনীয়,” বলেন জাহিদ।
শেষ পর্যন্ত এক আত্মীয়ের সহায়তায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে শিশুটির জন্য শয্যা পাওয়া যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে সাত ব্যাগ রক্ত ও প্লাজমা দিতে হয়। পরে হাসপাতাল থেকে ছাড় পেলেও শিশুটি এখনো দুর্বল এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ডেঙ্গুতে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে। পেটে ব্যথা, মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, রক্তপাত বা অন্যান্য সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
অধ্যাপক কবিরুল বাশারের সার্ভিলেন্স ও ফোরকাস্টিং মডেল অনুযায়ী, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, আবহাওয়ার পরিস্থিতি অক্টোবর পর্যন্ত এডিস মশার বিস্তারের জন্য অনুকূল থাকতে পারে।
“ডেঙ্গুর প্রকোপ এখনো শীর্ষে পৌঁছায়নি,” বলেন তিনি। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বর চলতি বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ মাসে পরিণত হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
আগস্টেই চলতি বছরের সর্বোচ্চ মাসিক ডেঙ্গু সংক্রমণ দেখা গেছে। ফলে সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করেছে। মানুষকে বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যেখানে এডিস মশার প্রজনন হচ্ছে, সেসব স্থান চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক ও প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণও বাড়াতে হবে।
ডেঙ্গু এখন আর শুধু মৌসুমি স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; বাংলাদেশে এটি ক্রমেই একটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে। হাসপাতালের শয্যার ওপর চাপ, দ্রুত বাড়তে থাকা রোগীর সংখ্যা এবং অনুকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস—সব মিলিয়ে সামনে আরও কঠিন সময়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তাই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ রোগীর নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত প্রস্তুতিই হতে পারে পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রধান উপায়।