ডা. মআআ মুক্তাদীর
বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তির নাম উচ্চারিত হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যাঁর নাম অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে, তিনি সৈয়দ আবদুস সামাদ। একসময় উপমহাদেশের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি। তাঁর অসাধারণ দক্ষতার জন্য সমকালীন ফুটবলপ্রেমীরা তাঁকে ডাকতেন ‘ফুটবলের জাদুকর’ নামে।
সৈয়দ আবদুস সামাদের জন্ম ১৮৯৫ সালের ৬ ডিসেম্বর, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ণিয়া জেলায়। জীবনের শেষ সময় তিনি কাটান পার্বতীপুরে। ১৯৬৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। আজকের বাংলাদেশে তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে বিবেচিত।
পেলে, দিয়েগো ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি কিংবা জিনেদিন জিদানের বহু আগে উপমহাদেশের মাঠে নিজের অসাধারণ নৈপুণ্যে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন সামাদ। বল নিয়ন্ত্রণ, ড্রিবলিং, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিখুঁত শটের জন্য তিনি ছিলেন সমকালীন ফুটবলের এক বিস্ময়।
তাঁকে ঘিরে বহু কিংবদন্তি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি ঘটনা ইন্দোনেশিয়ার জাভায় সর্বভারতীয় ফুটবল দলের সফরকে কেন্দ্র করে। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ম্যাচে সামাদের দুটি শক্তিশালী শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। এরপর তিনি রেফারিকে জানান, গোলপোস্টের উচ্চতা আন্তর্জাতিক মানের নয়। পরে মেপে দেখা যায়, গোলপোস্টের উচ্চতা নির্ধারিত মাপের তুলনায় চার ইঞ্চি কম ছিল। এই ঘটনা তাঁর অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার উদাহরণ হিসেবে এখনও উল্লেখ করা হয়।
আরেকটি বহুল প্রচলিত ঘটনায় বলা হয়, একটি ম্যাচের আগে মাঠ ঘুরে দেখে সামাদ অভিযোগ করেন যে মাঠের দৈর্ঘ্য আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নয়। পরে মাঠ মেপে তাঁর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। এতে ফুটবল সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পরিচয় ফুটে ওঠে।
সামাদকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত গল্পগুলোর একটি লন্ডনে সর্বভারতীয় দলের সফর। প্রচলিত বর্ণনায় বলা হয়, ব্রিটিশ দলের বিপক্ষে ম্যাচের আগে তিনি চার গোল করার চ্যালেঞ্জ দেন। পরে সেই ম্যাচে চারটি গোল করে সর্বভারতীয় দলকে জয় এনে দেন। যদিও এই ঘটনার স্বাধীন ও সমসাময়িক ঐতিহাসিক প্রমাণ সীমিত, তবুও এটি তাঁর অসাধারণ প্রতিভার প্রতীক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে।
ফুটবল ইতিহাসবিদদের মতে, সৈয়দ আবদুস সামাদ শুধু একজন দক্ষ খেলোয়াড় ছিলেন না। তিনি উপমহাদেশে আধুনিক ফুটবল কৌশল জনপ্রিয় করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর খেলার ধরন পরবর্তী প্রজন্মের বহু ফুটবলারের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ফুটবলে অনেক নতুন তারকার আবির্ভাব ঘটলেও সৈয়দ আবদুস সামাদের অবদান ধীরে ধীরে মানুষের স্মৃতি থেকে ম্লান হয়ে যায়। অথচ দেশের ফুটবল ইতিহাস সংরক্ষণে তাঁর জীবন ও কীর্তি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি।
বাংলাদেশের ফুটবলের শিকড় খুঁজতে গেলে সৈয়দ আবদুস সামাদের নাম এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলার নন, বরং উপমহাদেশের ফুটবল ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর অবদান নতুন করে মূল্যায়ন এবং যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি দীর্ঘদিনের।