কলা, বসনিয়ান সুন্দরী আর বিশ্বকাপে আমার দল বসনিয়া

বিজয় মজুমদার

(আমি এই লেখাটি গিন্নিকে না জানিয়ে লিখেছি। আশা করি, গল্পটা আপনারা তাঁকে জানিয়ে দেবেন না!)

খেলা দেখতে বসলে আমার ছেলের প্রথম প্রশ্নই থাকে, ‘তুমি কোন দলের সমর্থক?’

সাধারণত আমি তাকে একটি কথাই বলি—খেলায় আমি সব সময় পরাজিতদের দলে। বিশেষ করে, যদি আমাদের দেশ সেই খেলায় অংশ না নেয়।

তারপরও ফুটবল বিশ্বকাপ এলে মনে মনে কয়েকটি দলকে সমর্থন করি। এবার যেসব দেশের প্রতি আমার আলাদা টান, তাদের অন্যতম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা—সংক্ষেপে বসনিয়া। ইউরোপের এই রাষ্ট্রে মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।

বসনিয়ার ফুটবলের ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। ১৯০৮ সালে দেশটিতে ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হয়। সে সময় যে চারটি দল নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল, তার একটি ছিল মুসলিমানাস্কি এসকে। এখানে ‘এসকে’ অর্থ স্পোর্টস ক্লাব।

তবে বসনিয়াকে সমর্থন করার পেছনে আমার কারণটি অনেক আধুনিক। আর সেই কারণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের স্মৃতি।

কয়েক বছর আগে এক সম্মেলনে যোগ দিতে শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলাম। সম্মেলনের প্রথম দিন অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার ঠিক আগে এক সুন্দরী তরুণী এসে আমার পাশে বসার অনুমতি চাইল।

সুন্দরীকে না করে কে!

তিনি শুধু পাশে বসেই ক্ষান্ত দিলেন না, টুকটাক নানা প্রশ্নও করতে লাগলেন। বেশির ভাগ প্রশ্নই ছিল শ্রীলঙ্কাকে ঘিরে। বুঝতে পারলাম, তিনি আমাকে শ্রীলঙ্কার নাগরিক ভেবেই বসেছেন। আমিও তখন ভুলটা ভাঙালাম না।

অবশ্য বসনিয়ান সুন্দরীকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। শ্রীলঙ্কায় গিয়ে আমাকে স্থানীয় মানুষ ভেবে ভুল করার অভিজ্ঞতা আমার একাধিকবার হয়েছে। সেখানকার মানুষ প্রথমে সিংহলি ভাষাতেই কথা বলেন। আমি কিছুই বুঝি না দেখে অবাক হয়ে যান। তখন বলতে হয়, আমি শ্রীলঙ্কার নই, বাংলাদেশের মানুষ।

যদিও বাংলার বিজয় সিংহ বহু আগে লঙ্কা জয় করেছিলেন, কিন্তু সেটা তো বহু পুরোনো ইতিহাস।

বর্তমান ইতিহাস আমাকে লঙ্কা জয় করার সুযোগ না দিলেও বসনিয়ান সুন্দরী আমাকে এবং বাংলাদেশকে তাঁর হৃদয় জয় করার একটি সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আর সেই সুযোগের পেছনে ছিল একটি কলা।

হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন—একটি কলার কারণেই সুন্দরী মেয়েটি বাংলাদেশকে চিনে নিয়েছিল।

বিরতির সময় তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই কলাটা কোথায় পাওয়া যায় বলতে পারো?’

টেবিলে রাখা একটি বিশেষ ধরনের কলার দিকে ইঙ্গিত করেই প্রশ্নটি করেছিলেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’

তিনি বললেন, ‘কলাটা খেতে দারুণ সুস্বাদু।’

বিরতি তখনও চলছে। আমি ভাবলাম, সুযোগটা নেওয়া যাক। সম্মেলনস্থলের বাইরে বেরিয়ে দেখি, রাস্তার ওপারে কয়েকটি দোকান।

সামনেই দুজন পুলিশ কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদের জিজ্ঞেস করলাম, আশপাশে কোনো ফলের দোকান আছে কি না।

প্রথমে একজন পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে সিংহলি ভাষায় কিছু বললেন। আমি আন্দাজ করলাম, তিনি হয়তো ভাবছেন—আমি তো শ্রীলঙ্কান, তাহলে ইংরেজি বলছি কেন!

আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, ‘আমি শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের মতো দেখতে একজন বাংলাদেশি।’

এরপর তিনি পরিষ্কার ইংরেজিতে বললেন, রাস্তার ওপারেই একটি ফলের দোকান আছে।

আমি আবার জানতে চাইলাম, কলা কি পিস হিসেবে পাওয়া যায়?

তিনি বললেন, না, কেজি দরে কিনতে হবে।

দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই কলার কেজি কত?’

উত্তর এল—মাত্র ১৪০ রুপি।

মনে মনে ভাবলাম, কেজি দরে কিনে ঠকে যাচ্ছি না তো!

শেষ পর্যন্ত কপালে যা আছে ভেবে সুন্দরীর জন্য ১৪০ রুপি বাজি ধরেই এক কেজি কলা কিনে ফেললাম।

কলাগুলো দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের শবরী কলার মতো। নাম রথ কসেল

সুন্দরীর সামনে কলার ব্যাগটি রাখতেই তাঁর চোখ ছানাবড়া।

এন্তার ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বললেন, ‘এর দাম আমি কীভাবে শোধ করব?’

আমি বললাম, ‘যতবার এই কলার কথা মনে হবে, ততবার একটি দেশের নাম মনে করবে। সেই দেশটির নাম বাংলাদেশ।’

এবার অবাক হওয়ার পালা তাঁর।

তিনি বললেন, ‘তুমি তাহলে শ্রীলঙ্কান নও?’

আমি হেসে বললাম, ‘যদিও আমার দেশি ভাই বিজয় সিংহ একসময় লঙ্কা জয় করেছিলেন, কিন্তু আমি এবার লঙ্কা জয় করতে আসিনি। এসেছি তোমার হৃদয় জয় করতে।’

তিনি সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন করলেন, ‘বিয়ে করেছ?’

আমি বললাম, ‘এই তো বিপদে ফেললে!’

পৃথিবীর সব নারীর মন একই ছাঁচে গড়া কি না জানি না।

তিনি হেসে বললেন, ‘বাড়ি গিয়ে আর যা-ই করো, এই গল্পটা গিন্নির সামনে বলো না।’

বসনিয়ান সেই তরুণী আমাকে মনে রেখেছিলেন কি না জানি না। তবে বাংলাদেশকে তিনি মনে রেখেছিলেন।

পরের সম্মেলনে দেখা হতেই দূর থেকে বললেন, ‘হাই, বাংলাদেশ! হাউ আর ইউ? আমি কিন্তু তোমার দেশকে মনে রেখেছি।’

বলাই বাহুল্য, এই গল্পটা আমার গিন্নি এখনো জানেন না।

তবে তিনি এটুকু জানেন, ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই আমি বরাবরই বসনিয়ার ভক্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *