রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। নর্ডিক দেশগুলোর মতে, এই আস্থাই তাদের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির ভিত্তি। এখন সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায় উত্তর ইউরোপের দেশগুলো।
‘বাংলাদেশ অ্যান্ড নর্ডিক কান্ট্রিজ: প্রোগনোসিস ফর পার্টনারশিপ’ শীর্ষক এক আলোচনায় এই বার্তা উঠে আসে। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কসমস ফাউন্ডেশন। এতে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন কসমস ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, সরকারের প্রতি আস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা, আইনের শাসনের প্রতি আস্থা এবং নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা—এসবই নর্ডিক দেশগুলোর সাফল্যের মূল ভিত্তি। তবে এই আস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের সংস্কার, জবাবদিহি এবং সমঝোতার সংস্কৃতির মাধ্যমে তা গড়ে উঠেছে।
বক্তারা মনে করেন, বাংলাদেশের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া এবং জুলাই চার্টার দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করা, জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতের উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।
তাদের মতে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এর অর্থ হলো স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর ও স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন এবং শক্তিশালী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যেগুলোর ওপর নাগরিকরা আস্থা রাখতে পারেন এবং যেগুলো ক্ষমতায় যে-ই থাকুক না কেন, সবার জন্য সমানভাবে কাজ করবে।
আলোচনায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আস্থার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। নর্ডিক দেশগুলো নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেয়। তারা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক সীমান্তের প্রতি শ্রদ্ধার কথা পুনর্ব্যক্ত করে। এ কারণেই ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরোধিতায় তারা দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে বলে জানানো হয়।
বক্তারা স্মরণ করিয়ে দেন, স্বাধীনতার পর থেকেই নর্ডিক দেশগুলো বাংলাদেশের পাশে ছিল। ডেনমার্ক, নরওয়ে ও সুইডেন ১৯৭২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পাঁচ দশকের বেশি সময় পরও দুই পক্ষের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ রয়েছে।
তবে বর্তমানে এই সম্পর্কের ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে। উন্নয়ন সহায়তার প্রচলিত কাঠামো থেকে বেরিয়ে এখন বাণিজ্য, মানসম্মত বিনিয়োগ, সবুজ প্রবৃদ্ধি এবং যৌথ সমৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বলেন, আস্থা কোনো নরম মূল্যবোধ নয়; এটি একটি দেশের কঠিন অবকাঠামোর মতো কাজ করে। আস্থা লেনদেনের খরচ কমায়, সংস্কারকে সহজ করে, মানসম্মত বিনিয়োগ আকর্ষণ করে এবং সমাজকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
তিনি বলেন, প্রকৃত অংশীদারত্ব আস্থার ওপরই গড়ে ওঠে। এ কারণেই ডেনমার্ক বাংলাদেশের সঙ্গে ‘টেকসই সমৃদ্ধির অংশীদারত্ব’-এর কথা বলে। এটি সাহায্য বা দান নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব সমৃদ্ধির জন্য যৌথ উদ্যোগ।
নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হোকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ তার জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ চায়। এজন্য অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি, প্রশাসনিক দক্ষতা, ন্যায্যতা এবং নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বলেন, উন্মুক্ততা উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য কার্যকর কৌশল। গত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে সুইডেনের সম্পর্কেও এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নর্ডিক দেশগুলোর বার্তা স্পষ্ট। টেকসই উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদার করতে হলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কাজ হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করা। কারণ আস্থা শুধু সামাজিক মূল্যবোধ নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও অন্যতম ভিত্তি।