প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন। ২১ জুন মালয়েশিয়া এবং ২২ জুন থেকে পাঁচ দিনের জন্য চীন সফর করবেন তিনি। নতুন সরকারের ঘোষিত “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতির আওতায় এই সফরকে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রগুলো জানায়, সফরের মূল লক্ষ্য বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা।
মালয়েশিয়া সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করা। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার। বর্তমানে সেখানে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মরত আছেন।
তবে ২০২৪ সালের জুন থেকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ স্থগিত হওয়ায় নতুন কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার সুযোগ কমে যায়। এতে দেশের শ্রমবাজার ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও প্রভাব পড়ে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বৈঠকে শ্রমবাজার চালুর পাশাপাশি কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা, হালাল শিল্প এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হবে।
বাংলাদেশ আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায়। সে কারণে সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়া এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট আরসিইপিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পেতে পারে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করবেন। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং এবং জাতীয় পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে পৃথক বৈঠকের কথা রয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একই সফরে চীনের তিন শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।
সফরে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। আলোচনার প্রধান বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে অবকাঠামো উন্নয়ন, সবুজ জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কারিগরি শিক্ষা এবং গণমাধ্যম সহযোগিতা।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চীনের কাছে কয়েক বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন সহায়তা ও বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দিয়েছে। এর মধ্যে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে ভারত নয়, বরং মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত নয়। বরং অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টা।
গত দেড় দশকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থান ও অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের চেষ্টা করছে। এ প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের বেতন বকেয়া, চুক্তি লঙ্ঘন, নির্যাতন ও অবৈধ নিয়োগের অভিযোগ বহুবার সামনে এসেছে। শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলো আশা করছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শ্রমবাজার খুলে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। কর্মীদের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় পূর্ণাঙ্গভাবে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ সময়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী আয় বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী। অন্যদিকে মালয়েশিয়া কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে দুই দেশেই প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের ফলাফল অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সফরটি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য নয়, বরং নতুন সরকারের বৈদেশিক নীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হবে। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার প্রতিযোগিতামূলক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি পরিচালনা করা।