বাজেটে সংস্কৃতির অবস্থান: রাষ্ট্র কি ভুলে যাচ্ছে জাতির আত্মাকে?

জহিরুল ইসলাম কচি

“একটি জাতির বাজেট হলো সংখ্যার ভাষায় লেখা তার আত্মজীবনী।” — অ্যারন উইলডাভস্কি

২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ একজন নাগরিকের জন্য বছরে রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ব্যয় মাত্র ৪৬ টাকা—মাসে চার টাকারও কম, দিনে প্রায় ১৩ পয়সা। পরিচালন ব্যয় বাদ দিলে প্রকৃত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, গবেষণা, সংরক্ষণ ও উন্নয়নে মাথাপিছু ব্যয় নেমে আসে বছরে প্রায় ২০ টাকায়। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ যুক্ত করলেও একজন নাগরিকের জন্য বার্ষিক সরকারি ব্যয় দাঁড়ায় মাত্র ১১৩ টাকা—দিনে ৩১ পয়সা।

অন্যভাবে বলা যায়, একজন নাগরিকের জন্য রাষ্ট্র বছরে এক কাপ কফির দামেরও কম অর্থ ব্যয় করে তার শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সংগীত, নাটক, লোকসংস্কৃতি, স্মৃতি এবং কল্পনাশক্তি বিকশিত করার জন্য।

মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যারন উইলডাভস্কি লিখেছিলেন, “বাজেট হলো সংখ্যায় লেখা রাজনীতি।” তিনি আরও সতর্ক করেছিলেন, “এ বাজেট ইজ লাইক এ বিকিনি। হোয়ট ইট রিভিলস ইস সাজেস্টিভ, বাট হোয়াট ইট কনসীলস ইজ ভাইটাল।” রূপকটিতে কিছুটা লিঙ্গ-সংবেদনশীলতার অভাব রয়েছে এবং এতে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বা ‘মেল গেজ’-এর উপস্থিতিও লক্ষণীয়। তবে রূপকটির সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উইলডাভস্কি বোঝাতে চেয়েছিলেন, বাজেট যা প্রকাশ করে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সে কী আড়াল করে। কারণ বাজেট মূলত কোনো হিসাবের খাতা নয়; এটি ক্ষমতার মানচিত্র। কে গুরুত্ব পাবে, কে উপেক্ষিত হবে, কোন মূল্যবোধকে রাষ্ট্র স্বীকৃতি দেবে এবং কোনটিকে বাজারের হাতে ছেড়ে দেবে—বাজেট তারই রাজনৈতিক দলিল।

২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট একটি বিশেষ রাজনৈতিক মুহূর্তে প্রণীত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় ঘোষিত এই বাজেটের মূলমন্ত্র—“গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অভিমুখে যাত্রা”। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এই ঘোষিত দর্শনের প্রতিফলন কতটা ঘটেছে? কারণ রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি শুধু বরাদ্দের পরিমাণে নয়; বরং সংস্কৃতিকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে এবং কোন বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রকল্পের মধ্যে তাকে স্থাপন করা হচ্ছে, তার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়।

বাজেট বক্তৃতার ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে সরকার স্বীকার করেছে যে ফ্যাসিবাদ দেশের “সমাজ-সংস্কৃতির বুনন” ধ্বংস করেছে এবং “মানবিক বিবেচনাসম্পন্ন সাংস্কৃতিক সম্পর্ক” ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কার টেকসই হবে না। কিন্তু মাত্র কয়েক পৃষ্ঠা পরে, ১৯২ নম্বর অনুচ্ছেদে এসে সেই সংস্কৃতি আর সামাজিক সম্পর্ক, গণতান্ত্রিক চর্চা বা নাগরিকতার ভিত্তি নয়; তা হয়ে ওঠে “সৃজনশীল অর্থনীতি”, “তরুণ উদ্যোক্তা”, “কনটেন্ট” এবং “অর্থনৈতিক শক্তি”।

বাজেটের প্রকৃত দর্শন লুকিয়ে আছে তার অগ্রাধিকারে—বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং সর্বোপরি বিনিয়ন্ত্রণ (ডিরেগুলেশন)। অথচ একই দলিল “অর্থনৈতিক গণতন্ত্র”, “জনগণের ক্ষমতায়ন” এবং “বিনিয়ন্ত্রণ”-কে একই বাক্যে স্থান দিয়েছে। বাস্তবে এরা পরস্পরবিরোধী ধারণা। অর্থনৈতিক গণতন্ত্র মানে অর্থনীতিকে জনস্বার্থের অধীন করা; অন্যদিকে বিনিয়ন্ত্রণ মানে পুঁজিকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা। বাজেট এই দ্বন্দ্বকে আড়াল করে, কারণ এর রাজনৈতিক ভাষা গণতন্ত্রের, কিন্তু অর্থনৈতিক যুক্তি বাজারের।

এ বছরের বাজেটে “সৃজনশীল অর্থনীতি” একটি নতুন ধারণা হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত সংস্কৃতি খাতকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করার মধ্যে একটি নতুন স্বীকৃতি রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে লক্ষণীয় যে, সংস্কৃতি সম্পর্কে ব্যবহৃত শব্দভাণ্ডারে “অর্থনীতি”, “সেক্টর”, “প্রোডাক্ট”, “ভ্যালু চেইন”, “ব্র্যান্ড”, “এক্সপোর্ট-রেডি” এবং “গ্লোবাল বেঞ্চমার্ক”-এর মতো শব্দের আধিক্য রয়েছে। বিপরীতে শিল্প, স্মৃতি, সমালোচনা, নাগরিকতা, স্বাধীনতা এবং জনসম্পদের মতো ধারণাগুলো তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত। ফলে সংস্কৃতিকে একটি স্বতন্ত্র সামাজিক ও নান্দনিক ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং অর্থনীতির একটি উপখাত হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা স্পষ্ট।

এর ফলে সংস্কৃতির নিজস্ব কোনো মূল্য যেন আর অবশিষ্ট থাকে না। সংস্কৃতি মূল্যবান, যদি তা বৈদেশিক মুদ্রা আনে। মূল্যবান, যদি তা কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান বাড়ায়। মূল্যবান, যদি তা “বাংলাদেশ ব্র্যান্ড” নির্মাণে সহায়তা করে।

২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ৮২৬ কোটি টাকা এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জন্য ১ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই মন্ত্রণালয়ের সম্মিলিত বরাদ্দ ২ হাজার ১৫ কোটি টাকা, যা মোট জাতীয় বাজেটের মাত্র ০.২২ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর দাবি ছিল, জাতীয় বাজেটের অন্তত ১ শতাংশ তথ্য ও সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দ অনুযায়ী মাথাপিছু বার্ষিক সরকারি ব্যয় মাত্র ৪৯ টাকা। পরিচালন ব্যয় বাদ দিলে প্রকৃত সাংস্কৃতিক উন্নয়নে মাথাপিছু ব্যয় নেমে আসে প্রায় ২০ টাকায়। এমনকি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ যোগ করলেও মাথাপিছু ব্যয় দাঁড়ায় মাত্র ১১৩ টাকা।

অন্যদিকে, প্রথমবারের মতো সৃজনশীল অর্থনীতিকে একটি উদীয়মান খাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) উৎস থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট ৮০০ কোটি টাকার একটি সম্ভাব্য সৃজনশীল অর্থনীতি তহবিলের ধারণা সামনে এসেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।

তবে এই তহবিলের আর্থিক ভিত্তি ও কাঠামো নিয়ে কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন রয়ে গেছে। ঘোষিত ৮০০ কোটি টাকার মধ্যে ৫০০ কোটি টাকাই নির্ভর করছে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিলের ওপর, যা স্বভাবতই স্বেচ্ছামূলক এবং অনিশ্চিত। ফলে এই অর্থ কতটা সংগ্রহ করা সম্ভব হবে এবং তা কতটা নিয়মিত ও টেকসই হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই।

একই সঙ্গে চলচ্চিত্র, ওটিটি, অ্যানিমেশন, গেমিং, সংগীত, প্রকাশনা, অডিও-ভিজ্যুয়াল শিল্প কিংবা অন্যান্য সৃজনশীল উপখাতের মধ্যে এই তহবিল কীভাবে বণ্টিত হবে, কোন খাত কতটুকু পাবে, কী ধরনের নীতিমালা ও জবাবদিহির কাঠামোর মাধ্যমে তা পরিচালিত হবে—এসব বিষয়ও এখনো অনির্দিষ্ট। ফলে স্বীকৃতির এই নতুন পরিসর আশাব্যঞ্জক হলেও, এর বাস্তবায়ন কাঠামো, অর্থায়নের স্থায়িত্ব এবং উপখাতভিত্তিক অগ্রাধিকারের প্রশ্নে উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তা বিদ্যমান।

বাজেটের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংস্কৃতিকে প্রধানত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, পর্যটন সম্প্রসারণ এবং জাতীয় ব্র্যান্ডিংয়ের হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ সংস্কৃতির মূল্যকে তার নিজস্ব নন্দনতাত্ত্বিক, সামাজিক ও নাগরিক গুরুত্বের ভিত্তিতে নয়; বরং অর্থনৈতিক উপযোগিতার ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করার প্রবণতা স্পষ্ট।

এখানেই মৌলিক প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়—সংস্কৃতি কি কেবল কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যম, নাকি এটি একটি জাতির স্মৃতি, সমালোচনাশক্তি, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং কল্পনাশক্তির অন্যতম ভিত্তি?

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে সংস্কৃতি খাতে সরকারি ব্যয় গড়ে মোট জিডিপির প্রায় ০.৫ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ মোট জিডিপির প্রায় ০.০১২ শতাংশ। অর্থাৎ জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশ সংস্কৃতিতে প্রায় ৪০ গুণ কম ব্যয় করছে। এই ব্যবধান দেখায় যে, সংস্কৃতিকে এখনো উন্নয়ন, গণতন্ত্র এবং সামাজিক সংহতির একটি কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের অনেক দেশে সংস্কৃতিকে কেবল বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। ফ্রান্সে সিনেমা টিকিট, টেলিভিশন এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের আয়ের একটি অংশ পুনরায় চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সহায়তা, চলচ্চিত্র শিক্ষা, আন্তর্জাতিক বিপণন এবং শক্তিশালী প্রদর্শন অবকাঠামো দেশটির সাংস্কৃতিক উত্থানের ভিত্তি তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ মনে করে, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতি প্রণয়ন জরুরি। একটি স্বশাসিত জাতীয় চলচ্চিত্র তহবিল প্রতিষ্ঠা, জেলা পর্যায়ে প্রদর্শন অবকাঠামো ও চলচ্চিত্র ক্লাব নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, চলচ্চিত্র শিক্ষা, আর্কাইভ ও গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, স্বাধীন ও বিকল্প চলচ্চিত্রের জন্য অনুদান ও প্রদর্শনের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং ওটিটি ও সম্প্রচার খাত থেকে পুনর্বিনিয়োগের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংস্কৃতিকে কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে নয়, নাগরিক অধিকার ও জনসম্পদ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

একটি জাতির শক্তি শুধু তার অবকাঠামো, জিডিপি বা রপ্তানির পরিমাণে নির্ধারিত হয় না। তার প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে কল্পনাশক্তি, সমালোচনাশক্তি এবং সাংস্কৃতিক প্রাণশক্তির ওপর। আমরা সৃজনশীল অর্থনীতির ধারণাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু সংস্কৃতিকে কেবল অর্থনীতির ভাষায় সীমাবদ্ধ করা যায় না। কারণ সংস্কৃতি কোনো পণ্য নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতি, স্বাধীনতা, নন্দনবোধ এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার ক্ষেত্র।

সংস্কৃতিতে বিনিয়োগ ব্যয় নয়। এটি মানুষের ওপর বিনিয়োগ, নাগরিকতার ওপর বিনিয়োগ, গণতন্ত্রের ওপর বিনিয়োগ এবং শেষ পর্যন্ত একটি জাতির আত্মার ওপর বিনিয়োগ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *