রোনালদোকে ঘিরে পর্তুগালের সংকট

২০২৬ বিশ্বকাপে গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। একসময়ের দুর্দান্ত গোলমেশিন এখন পর্তুগাল দলের জন্য আশীর্বাদ নাকি বোঝা— সেই প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।

ব্রিটিশ সংবাদপত্র দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট এর ভাষ্য , পর্তুগাল আবারও নিজেদের সম্ভাবনাকে রোনালদোকেন্দ্রিক কৌশলের কাছে উৎসর্গ করছে। তাদের ভাষায়, মাঠে পর্তুগাল খেলছিল “দশ জন খেলোয়াড় এবং একটি মূর্তি” নিয়ে।

হিউস্টনে অনুষ্ঠিত ম্যাচে পর্তুগাল বল দখলে ছিল স্পষ্টভাবে এগিয়ে। দলটি প্রায় ৭৫ শতাংশ সময় বল নিয়ন্ত্রণে রাখে। তবু তারা গোল করতে পারেনি। ম্যাচজুড়ে রোনালদোর প্রভাব ছিল সীমিত। তিনি তিনটি শট নিলেও কোনোটিই লক্ষ্যে রাখতে পারেননি।

একটি আক্রমণে ব্রুনো ফার্নান্দেস ফাঁকা অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু রোনালদো নিজেই শট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বল বাইরে চলে গেলে ব্রুনোর হতাশা টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা পড়ে। এ ঘটনাও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সমালোচকদের মতে, রোনালদোর বর্তমান শারীরিক সীমাবদ্ধতা পর্তুগালের খেলার ধরনকে প্রভাবিত করছে। তিনি আগের মতো ডিফেন্ডারদের পেছনে দৌড়াতে পারেন না। উচ্চ গতির প্রেসিংয়েও তার অংশগ্রহণ সীমিত। ফলে দলের আক্রমণভাগে কাঙ্ক্ষিত গতি তৈরি হচ্ছে না।

তবে পর্তুগাল কোচ রোবের্তো মার্তিনেজ এসব সমালোচনা মানতে নারাজ। তার দাবি, রোনালদো শুধু অতীতের অর্জনের কারণে দলে নেই। বর্তমান পারফরম্যান্সের ভিত্তিতেই তিনি সুযোগ পাচ্ছেন। মার্তিনেজ বলেছেন, তার অধীনে ৩০ ম্যাচে রোনালদো ২৫ গোল করেছেন। তাই তাকে বাদ দেওয়ার প্রশ্ন আসে না।

কিন্তু পরিসংখ্যানের আরেকটি দিকও রয়েছে। বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে রোনালদো এখন টানা ১০ ম্যাচ ধরে গোলহীন। এই সময়ে তিনি ৮০১ মিনিট খেলেছেন। তার শেষ টুর্নামেন্ট গোল আসে ২০২২ বিশ্বকাপের আগে।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বেও রোনালদোর রেকর্ড প্রশ্নের মুখে। ছয়টি বিশ্বকাপ খেললেও তিনি এখন পর্যন্ত কোনো নকআউট ম্যাচে গোল করতে পারেননি। বিপরীতে পর্তুগালের কিংবদন্তি ইউসেবিও ১৯৬৬ সালের একমাত্র বিশ্বকাপেই নয়টি গোল করেছিলেন। এর মধ্যে ছয়টি ছিল নকআউট পর্বে।

এদিকে আরেকটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে তার নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে লাল কার্ড দেখার পর রোনালদোর অন্তত এক ম্যাচ নিষিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বিশ্বকাপে খেলতে পেরেছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। কিছু গণমাধ্যম ফিফার সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেছে।

রোনালদোর পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে লিওনেল মেসির সাম্প্রতিক সাফল্যের কারণে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে মেসি বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৬-তে উন্নীত করেছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, আর্জেন্টিনা ও পর্তুগালের মধ্যে মূল পার্থক্য এখানেই। আর্জেন্টিনা এখনও মেসিকে ঘিরে সাফল্য পাচ্ছে। কিন্তু পর্তুগাল একই কৌশল থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছে না।

ভক্তদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। একদল মনে করেন, রোনালদোর অভিজ্ঞতা এখনও দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বড় ম্যাচে তার উপস্থিতি আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, পর্তুগালের বর্তমান প্রজন্মের প্রতিভাবান ফুটবলারদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হলে দলকে আরও স্বাধীনভাবে খেলতে দিতে হবে।

ব্রুনো ফার্নান্দেস, বের্নার্দো সিলভা, ভিটিনহা, রাফায়েল লেয়াও ও জোয়াও ফেলিক্সের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া এই দলকে অনেকেই বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী স্কোয়াড মনে করেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দলটি কি নিজেদের শক্তি অনুযায়ী খেলছে?

কঙ্গোর বিপক্ষে ড্রয়ের পর সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। পর্তুগাল কি রোনালদোকে ভর করে বিশ্বকাপ জিতবে, নাকি রোনালদোকেন্দ্রিক কৌশলই তাদের পথের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে— ২০২৬ বিশ্বকাপের বাকি পথই তার উত্তর দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *