সোহেইল জাফর
১৯১৪ সালের ২১ জুলাই। ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে মুখোমুখি হয়েছিল ফ্লুমিনেন্স ও আমেরিকা এফসি। সে সময় ব্রাজিলে ফুটবল ছিল মূলত উচ্চবিত্ত শ্বেতাঙ্গদের খেলা। অনেক ক্লাবই কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় নিতে চাইত না। এমনকি কৃষ্ণাঙ্গদের খেলা দেখার সুযোগও ছিল সীমিত।
সেদিন ফ্লুমিনেন্সের হয়ে মাঠে নামেন কার্লোস আলবার্তো। নিজের কৃষ্ণাঙ্গ পরিচয় আড়াল করতে তিনি মুখে চালের গুঁড়ো মেখেছিলেন। কিন্তু ম্যাচের উত্তেজনায় ঘাম ঝরতে শুরু করলে সেই পাউডার ধুয়ে যায়, বেরিয়ে আসে তাঁর গায়ের প্রকৃত রং। দর্শকদের একাংশ তখন তাঁকে ‘রাইস পাউডার’ বলে বিদ্রূপ করতে থাকে। আজও ফ্লুমিনেন্সের সমর্থকদের অনেকে এই নামে পরিচিত—যা ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে বর্ণবাদের এক তিক্ত স্মৃতি হয়ে আছে।
১৯২১ সালের কোপা আমেরিকার ঘটনাটি ছিল আরও ভয়াবহ। সে সময় দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ, যা বর্তমানে কোপা আমেরিকা নামে পরিচিত, চলাকালে ব্রাজিলের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এপিতাসিও পেসোয়া নির্দেশ দেন—জাতীয় দল থেকে সব কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়কে বাদ দিতে হবে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ব্রাজিলকে একটি ‘সভ্য’ দেশ হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে হলে জাতীয় দলে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় থাকা উচিত নয়। তাঁর মতে, কালো খেলোয়াড়রা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে।
১৯৫০ সালের কথাই ধরা যাক।
ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল। স্বাগতিক ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ উরুগুয়ে। জিতলেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতবে ব্রাজিল।
টানটান উত্তেজনার সেই ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের হয়ে গোল করেন ফ্রিয়াসা। স্বপ্নের শুরু হয়ে যায়। কিন্তু ম্যাচের শেষ দিকে উরুগুয়ের দুটি গোল ব্রাজিলের সব আশা ভেঙে দেয়। ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় স্বাগতিকরা।
বিশ্বকাপে এই পরাজয়ের পর বর্ণবাদী মনোভাব নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ গোলরক্ষক মোয়াসির বারবোসার জীবন প্রায় নরকে পরিণত হয়। একটি সংবাদপত্র শিরোনাম করেছিল—‘বারবোসার দ্বিতীয় মৃত্যু’।
বারবোসা নিজেও আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “ব্রাজিলের আইনে সর্বোচ্চ সাজা ৩০ বছর। অথচ আমি ৪০ বছর ধরে সাজা ভোগ করছি।”
ব্রাজিলের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর এই দীর্ঘ হতাশা ও বঞ্চনার মধ্যেই একদিন ঝলসে ওঠে জিঙ্গা।
এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো—যাকে পৃথিবী চেনে পেলে নামে।
১৯৫৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি ব্রাজিলকে এনে দেন বিশ্বকাপ। তাঁর সাহসী খেলা, অসাধারণ ড্রিবলিং আর বলের ওপর অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ বিশ্বকে মুগ্ধ করে। ইউরোপ তাঁকে নাম দেয় ‘ব্ল্যাক সুপারস্টার’। পরবর্তী সময়ে পেলে ব্রাজিলকে আরও দুটি বিশ্বকাপ উপহার দেন।
নিজের আত্মজীবনীতে পেলে লিখেছিলেন, এই জয় শুধু একটি ট্রফির জয় ছিল না; এটি ছিল শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের অহংকারের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিজয়।
অনেকেই প্রশ্ন করেন—পেলের মধ্যে এমন কী ছিল? কেন তাঁকে এত মানুষ ভালোবাসত? তিনি কি অন্য কোনো পৃথিবীর মানুষ ছিলেন?
ইউরোপীয় ফুটবলের যান্ত্রিকতা ও শারীরিক শক্তির সঙ্গে যখন ব্রাজিলীয় ফুটবলাররা লড়াই করছিলেন, তখন পেলের খেলায় দেখা যায় এক অনন্য ধারা—যার নাম জিঙ্গা।
জিঙ্গাকে অনেকে নৃত্য বলে উল্লেখ করেন। আসলে এটি ব্রাজিলের সাম্বা নৃত্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা।
‘জিঙ্গা’ শব্দের অর্থ দোলা খাওয়া, সামনে-পেছনে ছন্দময়ভাবে নড়াচড়া করা। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ব্রাজিলের ইতিহাস।
ইউরোপীয় উপনিবেশকারীরা আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার দাসকে লাতিন আমেরিকায় নিয়ে এসেছিল। শৃঙ্খলিত সেই মানুষগুলো নিজেদের মুক্ত করার জন্য যেভাবে শরীর নড়াত, যেভাবে লাথি ও চাবুকের আঘাতে প্রতিক্রিয়া জানাত, সেখান থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় এক বিশেষ শিল্পরীতি—ক্যাপোয়েরা। দেখতে অনেকটা নাচের মতো হলেও এর ভেতরে ছিল আত্মরক্ষার কৌশল। জিঙ্গা সেই ক্যাপোয়েরারই অন্যতম মৌলিক মুদ্রা।
পেলের বাবা ডন্ডিনহো তাঁকে এই জিঙ্গা কৌশল শিখিয়েছিলেন। পেলে সেই জিঙ্গাকেই পরিণত করেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের প্রাণশক্তিতে। তিনি ও তাঁর সতীর্থরা প্রমাণ করে দেন, শ্বেতাঙ্গ পুরুষের যান্ত্রিক ফুটবলের বিপরীতে কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীর জিঙ্গা ফুটবলে নতুন প্রাণ এনে দিতে পারে।
আজকের ফুটবলে ব্যবসা ও পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অনেক বেশি। রোনালদো, মেসি কিংবা নেইমারকে প্রায়ই সংখ্যার হিসেবে বিচার করা হয়। কিন্তু পেলে ও তাঁর সময়ের খেলোয়াড়দের কাছে ফুটবল ছিল বলের সঙ্গে এক ধরনের কথোপকথন। তাঁরা ফুটবলের মাধ্যমে নিজেদের মনের কথা বলতেন। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেন। ফুটবল হয়ে উঠেছিল অসাম্প্রদায়িক শিল্প ও মানবিকতার এক শক্তিশালী ভাষা।
আরেকটি বহুল আলোচিত ঘটনা দিয়ে শেষ করা যাক।
১৯৬৭ সালে নাইজেরিয়ায় শুরু হয় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। ইগবো ও হাউসা জনগোষ্ঠীর দ্বন্দ্বে দেশটি বিভক্ত হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার দাবিতে বায়াফ্রা নামে একটি স্বঘোষিত রাষ্ট্রের উদ্ভব হলে সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। যুদ্ধ, দাঙ্গা ও মহামারিতে প্রাণ হারায় ২০ লাখেরও বেশি মানুষ। ঘরছাড়া হয় প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৬৯ সালের ২৬ জানুয়ারি আফ্রিকা সফরে যায় ব্রাজিলের ক্লাব সান্তোস। সান্তোসের জার্সিতে খেলতে নামেন পেলে।
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, পেলের খেলা দেখার জন্য যুদ্ধরত দুই পক্ষ ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি অন্যতম আলোচিত ঘটনা, যেখানে ফুটবল দেখার জন্য শত্রুপক্ষের মানুষ একই গ্যালারিতে বসেছিল বলে দাবি করা হয়। পেলের সতীর্থ জিলমার ও পেপে পরে উল্লেখ করেন, তাঁরা নিজ চোখে দুই পক্ষের মানুষকে একসঙ্গে খেলা দেখতে দেখেছেন।
একদিকে বন্দুকের ট্রিগার, অন্যদিকে পায়ের জাদু। পেলের নাম যেন সাময়িকভাবে যুদ্ধের ভয়াবহতাকেও থামিয়ে দিয়েছিল। ৪৮ ঘণ্টার সেই যুদ্ধবিরতি দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে সংঘাত নিরসনের পথও খুঁজে নেওয়া হয়।
কার্লোস আলবার্তো আজ আর বেঁচে নেই। কিন্তু তাঁকে উদ্দেশ করে ছুড়ে দেওয়া ‘রাইস পাউডার’ বিদ্রূপকে ফ্লুমিনেন্সের সমর্থকেরা নিজেদের শক্তির প্রতীকে পরিণত করেছেন। আজও ক্লাবটির ম্যাচে গ্যালারিতে সাদা চালের গুঁড়ো ছড়িয়ে উৎসব করতে দেখা যায় অনেক সমর্থককে। কেউ কেউ মুখেও পাউডার মেখে মাঠে আসেন। যে অপমান একদিন তাঁদের দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়েছিল, সেটিকেই তাঁরা পরিচয়ের গর্বে রূপান্তর করেছেন।
এই ক্লাব থেকেই পরে উঠে এসেছেন মার্সেলো, থিয়াগো সিলভা ও রোমারিওর মতো অসংখ্য তারকা ফুটবলার। ১৯৫২ সালে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে ক্লাবটি।
পেলে নেই, কিন্তু তাঁর অনুপ্রেরণা আজও বেঁচে আছে। নাইজেরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতায় যেমন তাঁর নাম শান্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিল, তেমনি আজও বিশ্বের প্রতিটি বঞ্চিত মানুষের কাছে ফুটবল একটি আশার নাম। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অসংখ্য শিশু বিশ্বাস করে, ফুটবল তাদের জীবন বদলে দিতে পারে।
এই কারণেই দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা একেকজন কিশোর মাঠে নেমে নতুন স্বপ্ন দেখতে শেখে। এই কারণেই পেলের গল্প আজও প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
যতদিন ফুটবল থাকবে, যতদিন গোল হবে, ততদিন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে উজ্জীবিত করবে ব্রাজিল।
কারণ ব্রাজিল শুধু একটি ফুটবল দল নয়।
ব্রাজিল এক অনুপ্রেরণার নাম।
ফুটবল যে সাম্যের কথা বলে, সম্প্রীতির কথা বলে, সেই সাম্য ও সম্প্রীতির অন্যতম প্রতীক ব্রাজিল।