‘আম কূটনীতি’: রসনা বিলাসের আড়ালে বাংলাদেশ-নেপাল সম্পর্কের নতুন মেলবন্ধন

কূটনীতির টেবিল মানেই কি কেবল নথিপত্র, প্রটোকল আর শীতল আলাপ? কখনো কখনো প্রথাগত সেই গণ্ডি পেরিয়ে কূটনীতি যখন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, তখন তার আবেদন হয় অনেক বেশি গভীর। সম্প্রতি নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই ঘটল। চাঁপাইনবাবগঞ্জের জিআই স্বীকৃত ১,৭৫০ কেজি ‘খিরশাপাত’ আম কেবল একটি ফল নয়, এটি এখন দুই দেশের পারস্পরিক বন্ধুত্বের এক মিষ্টি বার্তাবাহক।

নেপালের রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের ৩৬০ জনের বেশি বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো এই আমের ঝুড়িগুলো কি কেবলই সৌজন্যমূলক উপহার? ভূ-রাজনীতির কারবারিরা একে দেখছেন ‘সফট পাওয়ার’ বা নমনীয় শক্তির প্রয়োগ হিসেবে। খাদ্য ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে এই উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্কের যে বরফ গলানোর কাজ করছে, তা প্রথাগত কূটনৈতিক বার্তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। বাংলাদেশের দূতাবাস যাকে যথার্থই বলেছে—‘কূটনীতির এক অনন্য স্বাদ’।

বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ি-কাকরভিটা স্থলপথ ব্যবহার করে এই আম যখন নেপালে পৌঁছাল, তখন তা কেবল একটি রুট নয়, বরং দুই দেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক করিডোরকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলল। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি না হলেও, দীর্ঘদিন ধরে নানা কারণে এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে যেভাবে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল, তা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। তবে এই ‘আম কূটনীতি’ প্রমাণ করছে যে, বড় বড় রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি ছোট ছোট সাংস্কৃতিক উদ্যোগ কীভাবে আস্থার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরশাপাত আম কেবল বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের মুকুটে নতুন পালক নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্যের পরিচায়ক। নেপালের বাজারে এই আম উপহার হিসেবে পাঠানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে তার শ্রেষ্ঠ কৃষিপণ্যের ব্র্যান্ডিংকেও অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল। বিশ্বব্যাপী এখন ‘ফুড ডিপ্লোম্যাসি’ বা খাদ্য কূটনীতি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বিষয়। নিজের দেশের সেরা পণ্যটিকে যখন প্রতিবেশী দেশের নীতিনির্ধারকদের রসনায় পৌঁছে দেওয়া হয়, তখন তা কেবল পণ্য হিসেবে নয়, বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবেই গৃহীত হয়।

নেপালের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন আরও অনেক বেশি ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ বা সক্রিয়। এই উদ্যোগটির মূল সার্থকতা এখানেই যে, এটি দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন এই বন্ধুত্বের বার্তাকে পুঁজি করে বাণিজ্য, জলবিদ্যুৎ এবং কানেক্টিভিটি বা যোগাযোগ খাতে নতুন কোনো অধ্যায় উন্মোচন করা।

শেষ পর্যন্ত, কূটনীতি কেবল উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নয়; এটি সম্পর্কের সেই সূক্ষ্ম বুনন যা তৈরি হয় পারস্পরিক সম্মান ও সৌহার্দ্য থেকে। নেপালে পাঠানো আমের মিষ্টি স্বাদে যে তৃপ্তি, আশা করা যায়—দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সেই তৃপ্তি ও দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব বজায় থাকবে। আমগুলো কি কেবল আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নেপালের রাজপ্রাসাদে পৌঁছেছে? সম্ভবত না, এগুলো পৌঁছেছে দুই দেশের জনগণের হৃদয়ের কাছাকাছি এক নতুন গন্তব্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *